৭ মার্চ, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ আজ মঙ্গলবার, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের এক মহাকাব্য।

১৯৭১ সালে এই দিনে রাজধানীর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন,‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিল লাখো মানুষ। নির্মলেন্দু গুণ ৭ মার্চ জনতার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা দেখে পরবর্তীকালে রচনা করেছিলেন তার অমর কবিতা। তিনি লিখেছিলেন, ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য কি দারুণ অপেক্ষা আর উত্তেজনা নিয়ে… কখন আসবে কবি?… শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে… অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন… গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন… এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

আজ থেকে ৪৬ বছর আগের কথা। পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে পুরো জাতি তখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষয়, সে সময় অগ্নিঝরা একাত্তরের এদিনে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্জ্রগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘… এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেদিন রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার মুক্তিপাগল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই ভাষণ থেকেই মূলত স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম ঘটতে থাকে এ বাংলায়। বাঙালির নিজের দেশের হাজার বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। মঙ্গলবার সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি অনন্য দিন। প্রজন্মের পর প্রজন্মে যারা এই ঐতিহাসিক ভাষণ শোনেন, তখনই তাদের মানসপটে ভেসে ওঠে স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা আন্দোলন-সংগ্রামের মুহূর্তগুলো, আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের আদর্শে। নানা গবেষণার পর মাত্র ১৯ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কেমন ছিল ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান

সারা দেশ থেকে ছুটে আসা স্বাধীনতার মুক্তিপাগল মানুষের ঢলে এদিন রেসকোর্স ময়দানের চতুর্দিকে রীতিমতো মানুষের জনস্রোত ঘটেছিল। বিকেল ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের ক্ষমতা হারায় রেসকোর্স। ঢাকার চতুর্দিকে ভারি অস্ত্রেশস্ত্রে পাহারারত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। আকাশে উড়ছিল হানাদার পাকিস্তানি যুদ্ধ জঙ্গিবিমান। কিন্তু মুক্তিপাগল বাঙালির জনস্রোতের সেদিকে কারো কোনো ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ নেই। সবার শুধু অপেক্ষা কখন আসবেন তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে জনসমুদ্রের মঞ্চে আসেন মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। আকাশ কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। মঞ্চে দাঁড়িয়েই বিশাল জনসমুদ্রে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বর্জ্রকণ্ঠে আবৃত্তি করেন বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধু সাড়ে সাত কোটি বাঙালির উদ্দেশে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো…।’

এই একটি ভাষণে সেদিন নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধেু। বাঙালির নিজের দেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর অমোঘ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাঙালি কঠিন সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে দেশ থেকে হানাদারমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এরপর মুক্তিকামী বাঙালি একাত্তরে মাত্র নয় মাসে প্রবল পরাক্রমশালী পাক হানাদারদের পরাস্ত-পর্যুদস্ত করে ছিনিয়ে এনেছিল বাঙালির মহামূল্যবান অহংকার স্বাধীনতা। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, দুঃসাহসিকতা আর আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি অর্জন করল নিজস্ব মানচিত্র, লাল-সবুজের পতাকা।

ঐতিহাসিক দিনটিতে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পৃথক বাণী দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ভোর সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় এবং দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। সকাল ৮টায় দেশের সকল ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, উপজেলা, মহানগর ও জেলাসমূহের প্রতি পাড়া, মহল্লায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের পাশাপাশি দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সভা-সমাবেশ আয়োজন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য সংগঠনের সকল স্তরের নেতা-কর্মী এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহসহ সর্বস্তরের জনগণ ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের যৌথ উদ্যোগে দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে এক আলোচনা সভায় আয়োজন করেছে। এ ছাড়াও যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন দিবসটি পালনে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে।

Share

আরও খবর