বাংলাদেশ দলএশিয়া কাপের গতকালের খেলায় পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ গতকাল ব্যাটং বোলিং এবং ফিল্ডিং সর্বক্ষেত্রে দাপটের সংগে খেলেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে। এই জয়ে সকলের আনন্দের চাইতে কিছু লোক নিজেদের আনন্দটা একটু আলাদা উপভোগ করবেন। বিশেষ করে যারা ১৯৮০ এর দশকে বাংলাদেশের হয়ে জাতীয় ক্রিকেট দলে্র প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তারা শুধু আনন্দ নয় এই জয়গুলোকে দেখেন নিজেদের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অপমানের বন্যার কিছুটা প্রতিশোধ হিসেবে। তার একটি ঘটনা উল্লেখ করলাম নিচে। বিখ্যাত ক্রিকেট অলরাউন্ডার পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান বাংলাদেশকে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক হেয় করেছিলেন সেই ১৯৮৬ সালে।

১৯৮৬ সাল। বাংলাদেশের বয়স মাত্র ১৫ বছর, আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের বয়স মাত্র ১ বছর। একদিনের ক্রিকেটে আনুষ্ঠানিক ভাবে পথ চলা শুরু হয় বাংলাদেশের। ৩১ মার্চ জন প্লেয়ার গোল্ড লিফ ট্রফিতে (এশিয়া কাপ) নিরপেক্ষ ভেন্যুতে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। এই ম্যাচে বাংলাদেশের তৎকালীন অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুসহ ১১ জন খেলোয়াড়েরই অভিষেক হয়েছিল।

তবে এই মহেন্দ্র ক্ষণের পেছনেও রয়েছে এক ইতিহাস। সদ্যজাত বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নেই কোন বরাদ্দ। রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। তারপরও এগিয়ে যেতে হবে। এই দৃঢ় প্রত্যয়ই ছিল ১১ জন সহ সংশ্লিষ্ট সকলের। এশিয়া কাপ খেলতে যাবে, কিন্তু বিমানের টিকিট কেনার টাকাও নেই তখন বাংলাদেশের। এসিসি টাকা দিতে চেয়েছিলো কিন্তু বাংলাদেশ রাজি হলো না, বরং বাসে করেই গেলো। বাংলাদেশের তখন ব্যায়াম করার জিমন্যাশিয়াম নেই। ওরা ১১ জন বিদেশের জিমে ব্যায়াম করে ক্লান্ত। ঐ সময় স্যালাইন খাওয়া দরকার। কিন্তু বিদেশী স্যালাইন কেনার টাকাও নেই। দেশীয় উপায়ে লবন দিয়ে স্যালাইন বানানো হলো। আর এ নিয়ে পাকিস্তানি মিডিয়ায় কত হাসাহাসি। পরদিন শক্তিশালী পাকিস্তানের সাথে খেলা। রাতে ঘুম এলো না ১১ জনের চোখে।

সকালে খুশি মনে ১১ জন আগেই মাঠে ঢুকে গেলো প্র্যাকটিসে। কিন্তু পাকিস্তানের কেউ আসলো না। টসের সময় পাক অধিনায়ক ইমরান খান মাঠের বাইরে থেকে ইশারায় ডাকলেন বাংলার অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুকে। ইমরানের আপত্তি, তোমাদের সাথে টস করে কি লাভ? তোমরাই বলো কী চাও? ব্যাট নাকি বল? লিপু বললো, আমরা টস চাই। ম্যাচ রেফারিও চাপ দিলো ইমরানকে। তখন ইমরান বললো, তাহলে এখানেই টস করেন। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে আশরাফ হোসেন লিপু পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টসের গল্পটা মোটামুটি সত্যি। এতে তাঁর বাংলাদেশকে ছোট করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা, সেটা বলতে পারব না। তবে ইমরানের সেই প্রস্তাবে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম।

সেদিনের ৪৫ ওভারের ম্যাচে ওয়াসিম আকরাম, ইমরান খান ও আবদুল কাদিরদের মতো তারকা বোলারদের বিপক্ষে প্রথমে ব্যাট করে ৩৫.৩ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ৯৪ রান করে অভিষিক্ত বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশের পক্ষে ৪ বা ৬ ছাড়া সর্বোচ্চ ৩৭ রান করেন শাহেদুর রহমান। এ ছাড়া রফিকুল আলম ও গোলাম ফারুক উভয়ে ১৪ রান করে করেন। বাকিদের কেউই দুই অঙ্কের কোঠায় পৌঁছাতে পারেননি। তাদের মধ্যে ৪ জন শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। ভাষ্যকার হাসতে হাসতে বলে উঠলো, আজ যদি পাকিস্তানীদের স্ত্রী-রা বল করতেন, তারাও নিশ্চয়ই উইকেট পেতেন।

বাংলাদেশের ১০টি উইকেটের মধ্যে ৪টি নিয়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম, ৩টি আবদুল কাদির ও ২টি ইমরান খান। ৯৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানকে অবশ্য ৩২.১ ওভার পর্যন্ত খেলতে হয়েছিল। উইকেট হারিয়েছিল ৩টি। তার মধ্যে বাংলাদেশের জাহাঙ্গীর শাহ ২টি ও লিপু ১টি উইকেট নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের হয়ে মুদাসসের নজর ৪৭ রান করেছিলেন। এ ছাড়া মহসিন খান ২৮ ও জাভেদ মিয়াঁদাদ ১৫ রান করেছিলেন। রমিজ রাজা শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন।

সেদিনের বাংলাদেশের অভিষিক্ত দলঃ রকিবুল হাসান, নরুল আবেদিন, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু (অধিনায়ক), শাহেদুর রহমান, মিনহাজুল আবেদিন, রফিকুল আলম, গোলাম ফারুক, জাহাঙ্গীর শাহ, হাফিজুর রহমান, গোলাম নওশের ও সামিউর রহমান।

পাকিস্তান দলঃ মুদাসসের নজর, মহসিন খান, রমিজ রাজা, জাভেদ মিয়াঁদাদ, কাসিম ওমর, ইমরান খান (অধিনায়ক), ওয়াসিম আকরাম, জাকির খান, মনজুর এলাহি, আবদুল কাদির ও জুলকার নাইন।

আর আজ, বহুদিন ধরে ক্রিকেট বন্ধ পাকিস্তানে। স্পন্সররা চলে যাচ্ছে। তাদের একাডেমীগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জিম, প্র্যাকটিসের জন্য তারা এখন দুবাইয়ের জিমন্যাসিয়াম ব্যবহার করে। এমনকি ক্রিকেটের জন্য টাকাও নেয় বাংলাদেশ থেকে। পাকিস্থানের সেদিনের ঘটনার জবাব বেশ কয়েকবার দিয়েছে বাংলাদেশ। ‘৯৯-এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে হারার পর পাকিস্থানিরা এটাকে বলেছিল “অঘটন”! এর পরের বছর মুলতানের টেস্টে আরেক অঘটনের জন্ম হতে চলছিল। উইকেটকিপার রশীদ লতিফ মাটি থেকে বল তালুবন্দী করে আউটের আবেদন না করলে হয়ত সেদিনও আরেকবার জবাব দেওয়া হত! যার ফল ও পেয়েছেন বেচারা রশিদ লতিফ। এ অপরাধের নিষেধাজ্ঞায় আর কখনো ক্রিকেট মাঠে নামতে পারেননি তিনি। আর ২০১২ সালে এশিয়াকাপে জিততে জিততে হেরে যাওয়া ম্যাচের কথাও ভোলার নয়। তার জবাব টা তো গতকালের ম্যাচটা।

সেদিনের সেই অভিষেক দলটা আজ ক্রিকেট বিশ্বের এক অন্যতম আতঙ্কের নাম। তা টেস্ট, ওয়ানডে বা টি-২০ যে ফরমেটেই যাক না কেন। একদিন যা হাঁটি হাঁটি পা পা করে শুরু হয়েছিল মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিকরা সেই শুরুকে আজ নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়। আজ বাংলাদেশ দলের আরেক নাম টাইগার বা বাংলাওয়াস। এগিয়ে যাক টাইগার বাহিনী। ইমরান খান, রমিজ রাজা, নবোজাত সিং সিধু সহ যে সকল বড় খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতিবাচক কথা বলে হেয় করার চেষ্টা করেছেন অপেক্ষায় থাকুন উচিত জবাব পেয়ে যাবেন- বাংলাদেশের মানুষ এই প্রত্যাশাই করে।

মাহফুজুল ইসলাম সাইমুম।
তারিখঃ ০৩-০৩-২০১৬।

Share

আরও খবর