১৯ মে, অনলাইন ডেস্কঃ শেষ হয়েও যেন শেষ হচ্ছে না ঢাকা মহানগরীর ১৫ লাখ মানুষের ভোগান্তি। সবকিছু ঠিক থাকলেও শুধু ঢাকার ডিসি এবং রাজউক চেয়ারম্যানের একগুঁয়েমি আচরণের কারণে তারা নিজের বাড়িতে পরদেশি হয়ে আছেন। একাধিক বার অবমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিজস্ব সম্পত্তির নামজারি এবং খাজনা বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রামপুরা ব্রিজ থেকে খিলক্ষেত নিকুঞ্জ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য পরিবার চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। জমি-জমা, সম্পত্তি বেচাকেনা করতে পারছে না কেউ। এ হয়রানির অবসান হবে কবে, তাও জানে না কেউ। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ঢাকার ডিসি এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক চেয়ারম্যান আন্তরিক হলে সমস্যাটি এতদিন ধরে জিইয়ে থাকত না। জমি অধিগ্রহণপ্রত্যাশী এবং অধিগ্রহণ বাস্তবায়নকারী সংস্থাকেই প্রমাণ করতে হবে উল্লিখিত জমির প্রকৃত মালিক কে। তাদের কাছে এ সংক্রান্ত সব নথিপত্র গচ্ছিত থাকার কথা। অথচ তারা বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপণ করছেন। নানাভাবে ঘটনাটি জটিল করে তুলছেন। গত ৩ এপ্রিল আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এ সংক্রান্ত কাগজপত্র উপস্থাপন করার কথা থাকলেও অজুহাত দেখিয়ে সে সভায় তারা উপস্থিত হননি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ মে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিগ্রহণ অধিশাখা-১ এর উপ-সচিব মির্জা তারিক হিকমত স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে আগামী ২১ মে ঢাকার ডিসি এবং রাজউক চেয়ারম্যানকে এ সংক্রান্ত সব নথিপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে ১৩৮/৬১-৬২, ৯১/৫৭-৫৮ ও ২৩/৬৬-৬৭ নম্বর অধিগ্রহণকৃত জমি থেকে ১৩৮৫ দশমিক ২৮ একর জমির ওপর নির্মিত ভবন বা বাড়ির কতগুলো নকশা কত সালে দেওয়া হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। অপর দিকে ঢাকার ডিসিকে উপরোক্ত ভূমি অধিগ্রহণ মামলার অন্তর্ভুক্ত সব নথিপত্রের সত্যায়িত কপি পাঠাতে বলা হয়েছে।

রাজউকের নগর পরিকল্পনা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজউকের প্রয়োজনীয় জমি রেখে বাদ বাকি জমি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। সেসব জমির মালিকদেরকে বাড়ি করার নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাড্ডা, বারিধারা, নতুন বাজার, নয়ানগর, নর্দা, জগন্নাথপুর, জোয়ার সাহারা, কুড়িল ও কুড়াতলী এলাকার হাজার হাজার ছোট-বড় ভবন ও স্থাপনা রাজউক থেকে অনুমোদন করেই নির্মিত হয়েছে। যমুনা ফিউচার পার্ক ও সুবাস্তু নগরভ্যালীর মতো বিশাল বিশাল মার্কেট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যমুনা ফিউচার পার্ক ঘিরেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা যায়, রাজউক থেকে কখনো তাদের বলা হয়নি যে উক্ত জমি তাদের। এ ধরনের কোনো চিঠি ডিসি অফিসের কোথাও রক্ষিত নেই। কারণ, প্রেসিডেন্ট অর্ডারের পর, মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তের পর পত্রপত্রিকায় গণ-বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেসব জমি জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর বিষয়টি নিয়ে তো তাদের মাথা ঘামানোর কথা নয়। এর মধ্যে ডিসি অফিসের কোনো কোনো কর্মকর্তা কেন বিষয়টি নিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে উঠলেন সেটাই রহস্যজনক। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঢাকার ডিসি এবং রাজউকের চেয়ারম্যান সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করছেন। তারা জনগণ এবং ক্ষমতাসীন সরকারকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। ভূমি প্রশাসন-ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা তাদের থাকলেও কারও ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানার ওপর তাদের কোনো অধিকার নেই। অথচ তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেটাই করছেন। হঠাৎ করে তারা কেন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সে রহস্য অজানা।

পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, রাজউক থেকে নকশা পাস করিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে বাড়ি নির্মাণ করার পর বলা হচ্ছে এ জমি বা বাড়ির মালিক রাজউক। তাদের কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? এ ধরনের দাবি যারা করছেন, তাদের তো বিবেচনাবোধ থাকা উচিত। অন্যদিকে জমি অবমুক্ত করে নামজারির অনুমোদন ও খাজনা গ্রহণ করেও ঢাকা ডিসি অফিস এখন বলছে ওইজমি রাজউকের। তাই এর নামজারি বন্ধ থাকবে এবং খাজনা নেওয়া যাবে না। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা নিরীহ নগরবাসীর ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নর্দার বাসিন্দা আনোয়ার আলী বলেন, ‘যদি তাদের বাড়িঘর অধিগ্রহণ থেকে অবমুক্ত না-ই থাকত তাহলে ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজউক হাজার হাজার বাড়ির নকশা দিল কোন আইনে? তহশিল অফিসগুলো ভূমি মালিকদের নামে নামজারি সম্পন্ন করে খাজনা নিল কেন? তাছাড়া ব্যাংকগুলো বাড়ি, বাণিজ্যিক স্থাপনা, দোকানপাট ও কারখানার মালিকদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করল কীভাবে? এসব প্রশ্নের জবাব আমরা ঢাকার ডিসি এবং রাজউকের চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে জানতে চাই। ’ বাড্ডা, ভাটারা, জোয়ার সাহারা, বারিধারা, নতুন বাজার, নয়ানগর, জগন্নাথপুর, নর্দা, কুড়িল, কালাচাঁদপুর ও খিলক্ষেত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হঠাৎ করে চিঠি দিয়ে জমির খাজনা-খারিজ বন্ধ করে দেওয়ার নজির কোথাও আছে বলে কারও জানা নেই। তাদের নামে দলিল-দস্তাবেজ, রেকর্ডপত্র এবং দখল থাকার পরও ডিসি অফিস সে জমির খাজনা ও নামজারি বন্ধ রাখার চিঠি দিতে পারে না। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এদেশে কি আইন বলতে কিছু নেই?

স্থানীয় সূত্র জানায়, এ সমস্যাটি নিয়ে ২০১৫ সালে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এর সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের সরেজমিনে তদন্তপূর্বক অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকানা প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভূমি কর্মকর্তারা সে প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, জমির প্রকৃত মালিকরা রাজউক থেকে নকশা নিয়ে সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। তারা নিয়মিতভাবে খাজনা পরিশোধ করছেন। নামজারি করতেও তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। এসব জমিজমা, বাড়িঘর বন্ধক রেখে তফশিলি ব্যাংক থেকেও তাদের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। একাধিক ভূমি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ওইসব এলাকাবাসীর সম্পত্তির খাজনা-খারিজ বন্ধ করা হয়েছে। অধিগ্রহণ থেকে অবমুক্ত হওয়ার একাধিক প্রেসিডেন্ট অর্ডার, মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর ডিসি অফিস এবং রাজউক থেকে সে জমি নিজেদের দাবি করা আহম্মকি ছাড়া আর কিছু নয়। যদি সে জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ থাকত তাহলে কখনো তার খাজনা নেওয়া এবং নামজারি দেওয়া হতো না। গায়ের জোরে তো আর জমির মালিকানা টেকানো যায় না। ’

রাজউক চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী বলেন, অবমুক্ত করার বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। এখানে রাজউকের তেমন কিছু করার নেই। এরপর আমরা মানুষের কথা চিন্তা করে মাননীয় পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আগামী রবিবার ভূমি মন্ত্রণালয়ে সভা আহ্বানের জন্য পত্র দেব।

Share

আরও খবর