হিরোশিমা-নাগাসাকি2মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও সর্বাধিক এলাকা ব্যাপক বিস্তারী ও বিপর্যয়কর সংঘাত নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় পার্ল হারবার আক্রমন। যুদ্ধের শেষভাগে ১৯৪১সালের ৭ই ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে বোমা ফেলে জার্মানির মিত্র জাপান। আর এর প্রতিশোধ নিতে প্রত্যক্ষভাবে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। মনে করা হয় পার্ল হারবারে হামলার প্রতিশোধ নিতেই ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় এবং ৯ই আগস্ট নাগাসাকিতে দুটো পারমাণবিক বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। নিমেষেই করুণ মৃত্যু হয় লক্ষাধিক মানুষের। সভ্যতার ইতিহাসে এটিই ছিল সময়ের এককের হিসেবে সবচেয়ে বড় গণহত্যা।

এর আগেই ১৯৪৫ সালের ৮ই মে জার্মানি চূড়ান্তভাবে পরাজয় স্বীকার করে নেয় জার্মানি। জাপানও আত্মসমর্পনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রশ্ন হলে, এরকম প্রেক্ষাপটে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মানব বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের কতটুকু প্রয়োজনীয়তা ছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ বা যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য আদৌ এর দরকার ছিল কি?

১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট রাত ভোর হওয়ার আগেই ‘এনোলা গে’ নামের একটি বি-৫৯ বোমারু বিমান মেরিয়ানার টিনিয়ান দ্বীপ থেকে জাপান অভিমুখে রওনা দেয়। বিমানটির বিশেষভাবে নির্মিত বোমার খাঁচায় ছিল ‘লিটল বয়’ নামের ৯ ফুট বাই ২ ফুট ব্যাস ও ৯ হাজার পাউন্ড ওজনের একটি পারমাণবিক বোমা। পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫দিয়ে তৈরি ছিল এটি। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে হিরোশিমার মাটি থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট উপরে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ১০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আগুনের গোলা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বিশাল এলাকা জুড়ে। গতি, তাপ, আলো প্রভৃতি নানা ধরনের শক্তি মিলেমিশে তৈরি হয় অভাবনীয় এক বিস্ফোরণের যার শক্তি ছিল ১৫ হাজার টন টিএনটি-র সমান। বিশাল ব্যাঙের ছাতার মতে কুণ্ডলিতে ছেয়ে যায় হিরোশিমার আকাশ। নিমিষে মাটির সাথে মিশে যায় শহরের ৯০ শতাংশ এলাকা। মৃত্যু হয় ৭৫ হাজার মানুষের। ডিসেম্বরের মধ্যে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার।

এর তিনদিনের মাথায় বকস্কার নামের অপর একটি আমেরিকান বি-টোয়েন্টি নাইন বোমারু বিমান দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কাইউসু দ্বীপের কোকুরার দিকে উড়ে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গতিপথ পরিবর্তন করে নাগাসাকি শহরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় বিমানটি। এটি বহন করেছিল ফ্যাট ম্যান সাংকেতিক নামের আণবিক বোমা। এই বোমা উপাদান ছিল তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম। সেটির চতুর্দিক ছিল তার দিয়ে সংযুক্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক পদার্থ। এর সবগুলো একসাথে বিস্ফোরিত হয়। সেই বিস্ফোরণের মাত্রা দাড়ায় ২২ হাজার টন টিএনটির বিস্ফোরণ-শক্তির সমান।

লম্বায় ১২ ফুট ও ব্যাসে ৫ ফুট আয়তনের ফ্যাট ম্যান-এর বিস্ফোরণ ঘটানো হয় স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে। হিরোশিমার বোমার চেয়ে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও নাগাসাকির ভৌগোলিক কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম ছিল। তবুও নিমিষে মৃত্যুর সংখ্যা দাড়ায় ৭৪ হাজার। গুরুতর আহত হয় আরও ৭৫ হাজার মানুষ।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়ে অচিরেই ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। হিরোশিমা-নাগাসাকির বীভৎসতার কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ঘটনার চার সপ্তাহ পরে। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন গোপন রাখে যে পারমাণবিক বোমা ছিল ওগুলো। ফলে তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয় মৃত্যুপথযাত্রীরা। শরীরে সৃষ্ট ক্ষতের সঠিক পরিচয় নির্ধারণ করতে না পারার কারণেই মৃতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় বহুগুণ। বোমার আঘাত ছিল বীভৎস, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা।

অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিক উইলফ্রেড গ্রাহাম বুর্চেট বোমা নিক্ষেপের চার সপ্তাহ পর ২রা সেপ্টেম্বর টোকিও থেকে হিরোশিমা পৌঁছান। পরে তিনি নিজ চোখে দেখা বিবরণ পত্রিকায় ছাপানোর জন্য পাঠান। তিরিশতম দিনে হিরোশিমায় শিরোনামে বুর্চেট লিখেন: যারা পালাতে পেরেছিলেন তারা মরতে শুরু করেছেন। কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছেন চিকিৎসকরাও। চারিদিকে বিষাক্ত গ্যাসের আতঙ্ক। মুখোশ পরে আছেন সকলেই। তিনি আরও লিখেন, হিরোশিমাকে বোমা বিধ্বস্ত শহর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, দৈত্যাকৃতির একটি রোলার যেন শহরটিকে পিষে দিয়ে গেছে। পঁচিশ বা তিরিশ বর্গমাইল জুড়ে একটিও অট্টালিকা দাঁড়িয়ে নেই। তার ডেসপ্যাচে বুর্চেট আরও লিখেন, অক্ষত মানুষগুলো দিন কয়েক পরে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে ও হাসপাতালে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা তাদের শরীরে ভিটামিন-এ ইনজেকশন দেয়। ইনজেকশনের জায়গায় মাংসে পচন ধরে। এরকম মানুষদের একজনও বাঁচেনি। ১৯৪৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকায় ছাপা হয়বুর্চেটের এই লেখা। সাহসী সাংবাদিক বুর্চেট নিজেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৩ সালে ক্যান্সারে মারা যান। সে বছরই তার লেখা ‘শ্যাডো অফ হিরোশিমা’ বইটি প্রকাশিত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের শেষ নেই। বোমা হামলাস্থলের কেন্দ্রে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় কয়েক হাজার সেলসিয়াসে। মানব দেহসহ সবকিছু মুহূর্তে সম্পূর্ণ নাই হয়ে যায়। ভূ-পৃষ্ঠে, পাথরে বা কংক্রিটে দেহ অবয়বের অস্পষ্ট ছায়াচিহ্ন থেকে যায় কেবল। চোখ ধাধানো আলো আর মহাপ্রলয়ঙ্করী ঝড় বয়ে যায়। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এই সত্তর বছর পরেও বয়ে চলেছেন জাপানের সন্তান সম্ভবা মায়েরা। তাদের ভয়, যে আসছে তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাবে বিকৃত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্মাবে না তো সে।

প্রশ্ন হল বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে জাপানে ভয়াবহ এ বোমা হামলার কতটা প্রয়োজন ছিল। জাপানের সামরিক শক্তি ততদিনে সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে গেছে। ১৯৪৫ এর মে মাসে বার্লিন মুক্ত হওয়ার পর জার্মানির নাৎসি বাহিনী পরাজয় মেনে নিয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট—ইতালিও ততদিনে পরাজয় মেনে নিয়েছে। ইউরোপে যুদ্ধ শেষ। জাপানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য ২৬শে অগাস্ট পর্যন্ত সময় বেধে দেয়া হয়। পরাজয় মেনে নেয়ার কথা ভাবতে শুরু করে দেশটির হাই কমান্ড । এসবই ঐতিহাসিক সত্য।

এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কিংবা যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার কোনে প্রয়োজন ছিল না। এই বোমা নিক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা ছিল অন্যত্র। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সবাই জানতো জার্মানরা এ ধরনের বোমা তৈরির জন্য গবেষণা চালাচ্ছে। ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ম্যানহ্যাটন প্রজেক্ট নামে এ বিষয়ে গবেষণা কাজ শুরু করে। ১৯৪৫ সালের প্রথম ভাগে থিন ম্যান নামে পরিশুদ্ধ প্লুটোনিয়াম দিয়ে তৈরি একটি আণবিক বোমা প্রস্তুত ও তা পরীক্ষা করতে সক্ষম হয় দেশটির বিজ্ঞানীরা।

এরই সংশোধিত সংস্করণ ফ্যাট ম্যান ব্যবহার করা হয় নাগাসাকিতে। অন্যদিকে কোন পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ছাড়াই, পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি ভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও ট্রিগারিং ব্যবস্থার লিটল বয় নিক্ষেপ করা হয় হিরোশিমায়। পুরো কাজটিই করা হয় বেশ তাড়াহুড়ো করে, ঝুঁকি নিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পেছনে প্রথম উদ্দেশ্য ছিল, ইয়ালটা চুক্তি অনুসারে ইউরোপে যুদ্ধ শেষের পর সোভিয়েত রেড আর্মি যেন এশিয়ার যুদ্ধে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, নতুন উদ্ভাবিত এই অস্ত্রটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগের একটি পরীক্ষা চালানো এবং সেইসঙ্গে নিজেদের পরমাণু সক্ষমতা জাহির করা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণ তা ছিল রাজনৈতিক। চির প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু সে পরিকল্পনা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। অচিরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আরও শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য চুরমার করে দেয়।

কিন্তু মানব ইতিহাসের যা ক্ষতি তা ততদিনে হয়ে গেছে। শুরু হয়ে গেছে আত্মবিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর হাতে যে পরিমাণ অস্ত্র আছে তা দিয়ে এই ভূ-মণ্ডল ১৪ বার সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব। কাজেই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে এইসব ভয়ঙ্কর অস্ত্র ধংস করা হবে না-কি ত্বরান্বিত করা হবে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া।

শাহানা
১৩ আগস্ট, ২০১৫ইং।

Share

আরও খবর