৮ এপ্রিল, অনলাইন ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পটভূমি এবং প্রণব মুখার্জির সাথে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক কে.পি নায়ারের বিশ্লেষণধর্মী এক লেখায়। সেখানে লেখক বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া ‘কালার রেভ্যুলেশনে’র অজানা কাহিনী সম্পর্কে বলেছেন। যার উদ্দেশ্য ছিলো শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ইউনূসকে বসানো। যে রেভ্যুলেশন সফল করতে কলকাঠি নেড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তণ পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ ইউনূস।

সাংবাদিক কে.পি নায়ার তার বিশ্লেষণধর্মী লেখায় সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে লিখেছেন, প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। সম্ভবত ৪৫ বছরের পুরনো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক এই সম্পর্কের সাম্প্রতিক সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হবে রোববারের এই নৈশভোজ। এই নৈশ ভোজের মাধ্যমে প্রণব মুখার্জির উপর অর্পিত অনেক দায়-দায়িত্বসমূহ সামনে চলে আসবে যা ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ইন্দিরা গান্ধির থেকে তাঁর উপর এসেছে। ঐতিহাসিক ওই দিনে তৎকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মুজিবনগরকে একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সরকারের দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে ইন্দিরা গান্ধি প্রণব মুখার্জিকে রাজ্য সভায় আলোচনা শুরু করতে বলেছিলেন। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে প্রণব মুখার্জির এই ইতিবাচক ভূমিকা আরও জোরদার হয়েছিলো যখন ইন্দিরা গান্ধি তাকে পূর্ব পাকিস্তানের (তৎকালীন বাংলাদেশ) মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে ১৯৭১ সালের ২ সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরিতে অনুষ্ঠিত ইন্টার পার্লামিন্টারি ইউনিয়নের ৫৯তম কনফারেন্সে পাঠান।

৪৬ বছর আগের সে সব অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০১৩ সালে প্রণব মুখার্জিকে মুক্তিযুদ্ধ সন্মাননা, স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। এটি ছিলো রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার একমাত্র বাংলাদেশ সফর। শেখ হাসিনার এই ভারত সফরের দ্বিতীয় দিন এপ্রিলের ৮ তারিখে নয়া দিল্লীতে স্বাক্ষর হতে যাওয়া প্রায় তিন ডজন চুক্তির উপরে গুরুত্ব দিবেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু নির্মল সত্যটি হচ্ছে, সাত বছর পর শেখ হাসিনার এই রাষ্ট্রীয় সফরটি হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জি বিদায়ের প্রহর গুনছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনার পর নয়া দিল্লীর পানদারা রোডে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে ১৯৭৫ সালে ভারতের স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন প্রণব মুখার্জি। ঢাকা ফিরে আসার পরে এমনকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও শেখ হাসিনার প্রতি প্রণব মুখার্জির সেই আগলে রাখা শেষ হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রপতির স্মৃতিকথার একটি খন্ডে এই প্রথম এসব ঘটনা বিশদ আকারে তৃতীয় ভলিউমে বর্ণনা করে লেখা হচ্ছে যা নিয়ে এখনও রাষ্ট্রপতি কাজ করে যাচ্ছেন।

‘কালার রেভ্যুলেশনে’র মাধ্যমে ইউক্রেন, জর্জিয়া ও মিশরের ক্ষমতার পালা বদল হয়। সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পাশ্চাত্যের কালার রেভ্যুলেশনের পরিকল্পনা থেকে রক্ষা করেছেন প্রণব মুখার্জি। হিলারি ক্লিনটন এবং তার পূর্বসূরী যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তণ পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি উভয়েই ভাবতেন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সামাজিক ব্যবসার প্রবক্তা নোবেল জয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় গেলে দেশটির উন্নয়ন হবে। এরপর পরই হিলারি, কেরির মদদ নিয়ে ২০০৬ সালে রাজনীতিতে প্রবেশের চিন্তায় বিভোর হয়ে ওঠে ইউনূস। যা আর পরবর্তীতে বাস্তবে রুপ নেয়নি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ একে একে ইউনূসকে সমর্থন দিতে থাকে। প্রথম দিকে প্রাক্তণ আইরিশ প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসন এবং পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার খোলাখুলিভাবে ইউনূসকে সমর্থন দেয়। শেখ হাসিনা ও তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি বেগম খালেদা জিয়ার থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে ইউনূসকে তখন ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো।

২০১১ সালের মার্চে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে ইউনূসকে সরিয়ে দেয়া হয়। ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পে নেতৃত্ব দেয়া এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। এরপর ইউনূসের সমর্থনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ ও মানবন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হয়। এটি বলা হচ্ছিল যে, ইউনূসকে অপসারণের পর প্রতিবাদ জানিয়ে দেশব্যাপী যে আন্দোলনের সৃষ্টি হচ্ছিলো তা ছিলো হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পরিকল্পিত ‘কালার রেভ্যুলেশনে’র সূত্রপাত। সমসাময়িক অনেক দেশের ক্ষমতাসীনরা বিদেশ থেকে পরিচালিত এমন কয়েকটি জনপ্রিয় আন্দোলনের কারণে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ইউনূস ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ গরম হয়ে উঠলে, তৎকালীন ইউপিএ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রবণ মুখার্জি হিলারি ক্লিনটনের কাছ থেকে একদিন ফোন পেয়েছিলেন। হিলারি তখনকার ওবামা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। প্রণব মুখার্জিকে ফোন করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নজিরবিহীনভাবে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন হিলারি, যা তার মতো বা তার পূর্বসূরীদের মতো পদাধিকারের অধিকারী ব্যক্তিদের সাথে একেবারেই বেমানান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের একাধিক সূত্রে জানা যায়, গ্রামীন ব্যাংক থেকে ইউনূসকে সরিয়ে দিতে শেখ হাসিনার পরিকল্পনার কথা প্রণবকে জানিয়ে তা বন্ধ করতে আকূল আবেদন জানিয়েছিলেন হিলারি। হিলারি প্রণবকে এই কথা বলে অনুরোধ করেছিলেন যে, তার উচিত ইউনূসকে সমর্থন দেয়া। প্রণব মুখার্জিকে সরাসরি ফোন দেয়ার মতো কূটনৈতিক ঝুঁকির বিষয়ে হিলারি উৎসাহ পেয়েছিলেন দুই দেশের পরমানু চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক থেকে। প্রণব মুখার্জি তখন ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রী এবং হিলারি ছিলেন নিউইয়র্কের একজন সিনেটর এবং ইন্ডিয়া সিনেট ককাসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

একসূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রণব মুখার্জিকে হিলারি অনুরোধ করে এও বলেছিলেন যে ‘দীর্ঘমেয়াদে হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্ক নির্ভরযোগ্য হবে না এবং শেখ হাসিনার সরকার থেকে নয়াদিল্লীর দুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করা উচিত। পাশাপাশি নতুন সরকার প্রধান হিসেবে সম্ভাবনাময় ব্যক্তিত্ব ইউনূসকে সমর্থন দিয়ে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে মনোযোগ দেয়া উচিত।

প্রণব মুখার্জি এর কোনোটিই কানে নেননি। বরংচ তিনি শেখ হাসিনার প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাসে অটল ছিলেন।

দেশে ও বিদেশে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্নভাবে শেখ হাসিনার সোর্স অনেক শক্তিশালী। সম্ভবত ওয়াশিংটনে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের এক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এমন একটি বার্তা হাসিনা আগেই পেয়েছিলেন। এরপরে খুব শীঘ্রই হাসিনাও প্রণবকে ফোন করেছিলেন। সেখানে প্রণব হাসিনাকে এই কথা বলে আশ্বস্ত করেন যে, ‘ভারত সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পাশে থাকবে এবং এই বিষয় নিয়ে তার (হাসিনার) কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।’

এই ঘটনার পর, ঢাকার ক্ষমতার রদবদল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের কালার রেভ্যুলেশনের উত্থানের চেষ্টার মতো ষড়যন্ত্র বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর কিছুদিন পরেই, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসের সরে যাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত রায় প্রদান করে। চলতি সপ্তাহে ভারতের রাষ্ট্রপতিকে শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়তো বিদায় জানাবেন কিন্তু ওই ঘটনা তিনি সব সময় মনে রাখবেন।

পরিবারের দুঃসময়ে হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ওয়াজেদ যখন নয়াদিল্লীতে স্কুলে পড়তেন, ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রয়াত স্ত্রী শুভ্র মুখার্জি ছিলেন তাদের কাছে দ্বিতীয় মায়ের মতো। ওই সময়ে সজীব ও পুতুলের সব অবসর সময়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গি ছিলো শুভ্র মুখার্জির তিন সন্তানের দুইজন অভিজিৎ ও শর্মিষ্ঠা।

দুই বছর আগে শুভ্র মুখার্জির মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা দেশের সব কিছু ফেলে শুভ্র’র শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শোক সন্তপ্ত রাষ্ট্রপতির পাশে থেকে তাকে সান্ত্বনা দেন। ২০১০ সালে হাসিনা যখন নয়া দিল্লীতে গিয়েছিলেন, প্রণব মুখার্জি তখনই হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য বলেছিলেন। তার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই সফর হবে বলে হাসিনা তাকে বলেছিলেন। সাথে এ কথাও বলেছিলেন যে, নির্বাচনকে খুব সামনে রেখে ওই ভারত সফর থেকে তিনি খালি হাতে ফিরতে চান না। এই কথোপকথোনের মধ্যেই শেখ হাসিনার ভারত সফরের সব অর্জন বা ব্যর্থতার সব বিষয়ে প্রণব মুখার্জির ভূমিকার বিষয়টি নিহিত রয়েছে।

Share

আরও খবর