শান্তি রঞ্জন সমদ্দার

১১–০৯–১৯৩০, মধ্য রাত। ব্রিটিশ পুলিশের একটি বড় দল বরিশালের ঝাউতলার দ্বিতল একটি বাড়ীকে ঘিরে রেখেছে। গোয়েন্দাদের তথ্য মতে তাদের কাঙ্ক্ষিত শিকার এই বাড়ীতেই আছে! কিন্তু অন্ধকারের কারণে তারা বাড়ীর মধ্যে হানা দিতে পারছে না। আর ওদিকে এই অন্ধকারকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর কথা চিন্তা করলেন তাদের কাঙ্ক্ষিত শিকার! পালাবার পথ খুঁজলেন। কেননা তিনি জানতেন– ওদের হাতে ধরা পড়লে নিশ্চিত জেল কিংবা কালাপানি। অতি সন্তর্পণে­­­­­­ দোতলার রেলিং টপকে মাটিতে নামলেন। নেমেই বুঝতে পারলেন ভুল হয়ে গেছে পালাবার কোন পথ নেই! কে একজন তাঁকে জাপটে ধরেছে। অন্ধকারেই বুঝলেন ইনি বরিশাল পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা। যুবক খেয়াল করে দেখলেন ধ্বস্তাধস্তিতে তাঁর নিজের গায়ের জামাটা ছিড়ে গেছে! ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন তিনি! পুলিশ কর্মকর্তার জামাটাও একটানে ছিড়ে ফেলে বললেন “আমার জামা ছিঁড়ে তুমি তোমার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছো, তাই তোমার উপযুক্ত পুরষ্কার দেয়াটা আমার কর্তব্য ছিলো।” পুলিশ কর্মকর্তা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন!

এটি কোন গল্প নয়। বহু অযত্ন আর অবহেলায় কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক অকূতভয় বিপ্লবীর সাহসিকতা আর তাঁর দেশপ্রেমের ইতিহাস! নাম-শান্তি রঞ্জন সমদ্দার। এই দিনেই তাঁর জন্ম ও মৃত্যু! ২০-১২-১৯১৩, তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার ঘাঘড় থানার বাগধা গ্রামে (বর্তমানে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রাম) বনেদী সমদ্দার পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা শীতল রঞ্জন সমদ্দার, মা ভগবতী দেবী। ৬ ভাই আর ৩ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।

৬ বছর বয়সে তাঁর লেখা পড়ার পরিচর্যার জন্যে পাঠিয়ে দেয়া হয় মামা বাড়ী বরিশাল। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করানো হয় বিএম স্কুলে। এখানে তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯২৯ সালে মেট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে বরিশাল বিএম কলেজে আই এ ভর্তি হন। এখানে পড়ার সময় তিনি যুক্ত হন কাউনিয়া বয়েজ স্পোর্টিং ক্লাবের সাথে। সূত্র মতে, তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন ভারোত্তলনে বরিশাল চ্যাম্পিয়ন। মূলত এই ক্লাব সূত্রেই তাঁর রাজনীতিতে হাতে খড়ি।

প্রথমে তিনি ডঃ অরুণ গূহ(স্বাধীন ভারতের ডেপুটি ফাইনান্স মিনিষ্টার)-এর নেতৃত্বে যুগান্তর পার্টিতে যোগদান করেন এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আরেক বিপ্লবী দেবেন্দ্র নাথ ঘোষের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন পার্টির বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। সেই সময়ে তিনি ছিলেন বরিশালে সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী। তাঁর বিপ্লবী রাজনীতির বিষয়ে পরিবারের কেউই কিছু জানতেন না। এ প্রসঙ্গে তাঁর ছোট ভাই অনিল সমদ্দার বলেন—“বড় দাদা কলেজ ছুটিতে বাড়ী আসলেই সারা রাত জেগে বই পড়ার নামে তিনি পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ড কাজগুলোই করতেন। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হবার পরপরই সবাই জানতে পারেন তাঁর বিপ্লবী রাজনীতির কথা!”

১৯৩০ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে বরিশাল জেলে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে বগুড়া ক্যাম্প এবং আলীপুর জেলে পাঠানো হয়। সবশেষে তিনি হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে ১৯৩৬ সালের মার্চ মাসের ১৭ তারিখ মুক্তি পান। এরপর আরো দুই বছর অর্থাৎ ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়। জানা যায় তিনি গ্রেফতার হবার পর তাঁকে রাজসাক্ষী হবার জন্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর এবং পরিবারের উপর চাপ প্রয়োগ করা হয় অন্যথায় তাঁর ফাঁসি এবং সমদ্দার পরিবারের সব ধরনের ব্যবসা বন্ধ করে দেবার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। আর তাঁর মা তাঁর এই সিদ্ধান্তকে দৃঢ় ভাবে সমর্থন করেন।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি আবার গোপনে বৈপ্লবিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন। এমতাবস্থায় তাঁর জ্যাঠামশায় কেদারেশ্বর সমদ্দার কোন উপায়ান্তর না দেখে সমদ্দার পরিবারের ট্রান্সপোর্ট ও চাল রপ্তানীর ব্যবসা তাঁর হাতে তুলে দেন। এর কিছুদিন বাদেই পারিবারিক সিদ্ধান্তে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপরে পারিবারের চাপে সম্পূর্ণ ভাবেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

জেলে অন্তরীন থাকা কালে তিনি প্রচুর পড়াশুনা করেন এবং নিজেকে সাম্যবাদের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা পর্যায়ক্রমে দেশ ছেড়ে চলে যান। তাঁকেও দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি জন্মভূমি ছাড়তে রাজি হননি। তিনি মনে করতেন জন্মভূমি হল স্বর্গ। তাই সবার পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি দেশেই থেকে যান। আর নিজেকে নিবেদন করেন দেশ গড়ার কাজে। তিনি যে খাঁটি সাম্যবাদী তা শুধু কথায় না কাজেই প্রমান করলেন বারবার। তিনি বহু ভূমিহীনদের আশ্রয় দিলেন নিজের ভূমিতে। সুবিধা বঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের অর্থ সাহায্য ছাড়াও তাদের মৌলিক চাহিদা পুরন করেছেন বছরের পর বছর ধরে। আর অসহায় মানুষের সহায় তো তিনিই ছিলেন। তাই তাঁকে সবাই বড় কর্তা বলেই সম্মোধন করত। পেয়েছিলেন দানবীর উপাধী। আর তাতে তাঁর মা ভগবতী দেবীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সব কিছুই চলছিল ঠিকমত।

কিন্তু হঠাৎ করে কোথায় যেন জীবনের তাল কেটে গেল বিপ্লবীর। জীবনে নেমে আসল একের পর এক বিপর্যয়। এক এক করে স্বর্গত হন যথাক্রমে তাঁর বাবা, কাকা, জ্যাঠামশায় এবং মা। এমতাবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী। অনেক চেষ্টা করলেন, বাঁচাতে পারলেন না। মাত্র ১০ মাস বয়সী কনিষ্ঠ সন্তানকে রেখে ১৯৬২ সালে তাঁর স্ত্রী পরলোক গমন করেন। আর এমন পরিস্থিতিতে একদল সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৎকালীন প্রশাসনের মাধ্যমে তাঁকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালায়। সঙ্গত কারনেই তখনকার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট তাঁকে আশাহত করে ভীষন ভাবে। সূত্রমতে তিনি এ সময়ে মানসিক ভাবে অনেক ভেঙে পড়েন এবং প্রবল ধ্বসের মুখে পড়ে তাঁর আর্থ-সামাজিক অবস্থান। কিন্তু বিপ্লবের চেতনা যাঁর মধ্যে তিনি কেন হারতে চাইবেন? আবার তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ১৯৬৩ সালে তিনি পারিবারিক সিদ্ধান্তে ২য় বারের মত বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। নতুন করে সবকিছু শুরু করেন। এবার বাঁধ সাধে তাঁর নিজের শরীর। মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সেখানের ডাক্তাররা জানান তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত এবং হাতে খুব অল্প সময়! তিনি মেনে নিলেন তাঁর ভবিতব্য! শুধু চেষ্টা করলেন শেষ বারের জন্যে জন্মভূমিতে ফেরার। প্রকৃতি কেন জানি আবারও মুচকি হাসল! তিনি পারলেন না তাঁর স্বর্গদেশে ফিরতে। এই ক্ষনজন্মা মহান বিপ্লবী ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখ চির নিদ্রায় নিদ্রিত হন।

লেখকঃ দেবাশীষ সমদ্দার। সঙ্গীত পরিচালক।

Share

আরও খবর