মস্তিষ্কপারকিনসন, মস্তিষ্কের এই রোগটি সম্পর্কে সর্ব প্রথম ধারণা দেন জেমস পারকিনসন। তার নাম অনুসারেই এই নাম। সারাক্ষণ হাত-পা কাপা, শরীরের মাংসপেশি অস্বাভাবিক শক্ত হয়ে থাকা, স্পর্শকাতরতা কমে যাওয়া এই উপসর্গগুলো সম্পর্কে জেমস পারকিনসনই সর্বপ্রথম ধারণা দেন।

পারকিনসন রোগ (Parkinson’s Disease) হল এক প্রকারের নিউরো-ডিজেনারাটিভ বা স্নায়ু-অধঃপতনজনিত রোগ। রোগটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন- পারকিনসোনিজম (Parkinsonism) বা প্যারালাইসিস এজিট্যান্স (Paralysis agitans) বা শেকিং পালসি (Shaking Palsy)| এ রোগটি সবচেয়ে পরিচিত নিউরো-ডিজেনারাটিভ রোগের মধ্যে দ্বিতীয়। বিভিন্ন ওষুধ বা বিষাক্ত পদার্থের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, ক্রমাগত মাথায় আঘাত পাওয়া (যেটা মুষ্টিযোদ্ধাদের হয়ে থাকে), নিউরোসিফিলিস, উইলসন ডিজিজ, হানটিংটন ডিজিজ ইত্যাদি রোগের কারণে পারকিনসন ডিজিজ হতে পারে। এর বেশির ভাগ কারণই অজানা।

শ্রেণিবিন্যাস
* প্রাইমারি পারকিনসনিজম : প্যারালাইসিস এজিট্যান্স বা পারকিনসন বা ইডিওপ্যাথিক পারকিনসনিজম।

* সেকেন্ডারি পারকিনসনিজম : পোস্ট-এনকেফালাইটিক = এনকেফালাইটিস লিথার্জিকা।

এ রোগ সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সের লোকদের হয়ে থাকে। ভাবলেশহীন মুখ-অবয়ব, মুখ দিয়ে লালা পড়া, হাঁটা বা চলাচল শুরু করতে দেরি হওয়া, ছোট পদক্ষেপে দ্রুত লয়ে হাঁটা, হাঁটার সময় হাত না নড়া, হাঁটতে হাঁটতে ঘুরতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, সবসময় হাত-পা কাঁপা, মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষমতা হারানো ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত থাকে পারকিনসন রোগীর জীবন।

উপসর্গ ও লক্ষণ
শরীরে দুর্বলতা ভাবলেশ, মাথায় কিংবা হাতের কম্পন হওয়া, বিভ্রান্তি এবং স্মৃতিশক্তির বিলোপ, ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি এবং চোখের পাতায় কম কম্পন অনুভূত হওয়া, পেশির অনমনীয়তা ভাব, ধীরগতির চলাফেরা, ভারসাম্য রক্ষায় অপারদর্শিতা, বিশ্রামের সময় মাথায় কিংবা হাতে মৃদু কম্পন অনুভব করা, বিষাদগ্রস্ত ইত্যাদি লক্ষণগুলোই পারকিনসন রোগের প্রধান উপসর্গ। এসব লক্ষণ ধরা দিলেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কী করা উচিত
সিটিস্ক্যানসহ রক্তের আরও কিছু পরীক্ষা করা হয় ঠিক কী কারণে রোগটি হয়েছে তা নির্ণয় করার জন্য। ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে এ রোগের চিকিৎসা করাতে হয়। ইলেকট্রোথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ইত্যাদির মাধ্যমে পুনর্বাসন করাই হল চিকিৎসার মূল লক্ষ্য।

রোগ নির্ণয়ে পরবর্তী করণীয়
* নিজেকে অতিমাত্রায় ক্লান্ত করে তুলবেন না। বিশ্রামের বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করুন, কেননা চাপ এবং অবসাদ দুটোই এ রোগের উপসর্গগুলোকে আরও খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। ভাল খাবার খান এবং নিজের প্রতি আরও যত্নশীল হোন।

*  ফিজিক্যাল থেরাপি, পেশিতে যত্ন সহকারে ম্যাসাজ এবং যোগ ব্যায়াম হয়তো আপনার চলাচলকে সাবলীল করে তুলতে পারে, কিন্তু এ ধরনের কোন উদ্যোগ নেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

চিকিৎসা
পারকিনসন রোগের কোন প্রতিষেধক নেই। রোগের লক্ষণ কমানোর জন্য কিছু ওষুধ সেবন করতে হয়। লেভোডোপা ও কার্বিডোপা সেবনে লক্ষণগুলো অনেকাংশে কমে যায়। এখন পর্যন্ত পারকিনসন রোগের এটাই সেরা ওষুধ। এ ছাড়া ব্রোমোক্রিপটিন, সেলেজিলিন, এমানটিডিন, অ্যান্টিকলিনার্জিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া সার্জারি (DEEP BRAIN STIMULATION) করা যায়। এ রোগ পুরোপুরি ভাল হয় না। তাই আক্রান্তদের ওষুধ সেবনের পাশাপাশি লাইফস্টাইলেও পরিবর্তন আনা জরুরি।

* পারকিনসন রোগে আক্রান্তদের পুষ্টিকর সুষম খাবার খেতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল থাকতে হবে। আক্রান্তদের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এ জন্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খাওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।

* আক্রান্তরা অনেক সময় হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আহত হন। আবার বয়স বেশি বলে পড়ে গিয়ে শরীরের হাড় ভেঙে যায়। এটি প্রতিরোধ করতে হলে সচেতন হতে হবে। হাঁটার সময় তাড়াহুড়া করবেন না। কেউ ডাকলে হঠাৎ করে না ঘুরে আস্তে আস্তে ইউ-টার্ন নিন। হাঁটার সময় সঙ্গে কোন কিছু বহন করবেন না। কম বোতাম বা চেইন আছে এমন পোশাক পরুন। রোগটির প্রতিরোধ নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও ভাল ফল মিলেনি।

অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা
যারা প্রতিনিয়ত প্রাত্যহিক কাজ সম্পাদনে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সমস্যায় ভুগছেন, অকুপেশনাল থেরাপি তাদের ভালভাবে সাহায্য করতে পারে। অকুপেশনাল থেরাপির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্যাগ্রস্ত মানুষকে তাদের সমস্যা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রাত্যহিক কাজকর্মে অংশগ্রহণ করানো। একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমস্যাগ্রস্ত মানুষ এবং সমাজের সঙ্গে কাজ করেন এবং তাদের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করেন, তাদের কাজে পরিবর্তন নিয়ে আসেন অথবা তাদের কাজের পরিবেশকে আংশিক বা পুরো পরিবর্তন করে তাদের ভালো একটা সমর্থন জুগিয়ে কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেন। তাই পারকিনসন রোগ সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকুন।

অধ্যাপক ডা. শাহরুখ আহমেদ
এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমডি (নিউরোলজি)
মেডিসিন ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালটেন্ট, ল্যাবএইড হাসপাতাল
তারিখঃ ২৬/০৮/২০১৬
Share

আরও খবর