১৯৭৮ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী ও বাংলার মোহাম্মদ আলী আবদুল হালিম।

“আবদুল হালিম” বিশ্ব দরবারে গর্জে ওঠা বাংলার প্রথম বাঘ। তাঁকে বলা হতো বাংলার মোহাম্মদ আলী। তিনি বাংলাদেশের হয়ে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পদকজয়ী বক্সার। ১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী। কিংবদন্তি এই বক্সার-এর সঙ্গে একই রিংয়ে সেসময় নেমেছিলেন বাংলার মোহাম্মদ আলী। তবে বাংলার আলীকে নকআউট করেননি ৩ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী। পরম মমতায় সেদিন আবদুল হালিমকে নিজের বাহুবন্ধনে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন মোহাম্মদ আলী।

সাবেক এই বক্সিং চ্যাম্পিয়ন বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে চুক্তিতে কোচিং করান। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি আড্ডা দিলেন টাইমস টু হ্যালো’র সাথে, বললেন তাঁর চিন্তা ও প্রত্যাশার কথা। করলেন পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ।

দি টাইমস ইনফোঃ কেমন আছেন?
আবদুল হালিমঃ ভাল আছি।

দি টাইমস ইনফোঃ খেলার জগতে আসার ইতিহাসটা জানতে চাই?
আবদুল হালিমঃ ১৯৩৫ সালের ঘটনা। আমার বাবা শেখ ফইজুদ্দিন। বাবা তাঁর ১৭-১৮ বছর বয়সে বাসা থেকে রাগ করে বেরিয়ে চলে যান কলকাতায়। সেখানে এক কর্নেলের অধীনে উনি কাজ করতেন। কর্নেল সাহেব শরীর ফিট রাখার জন্য জিম করতেন। বাবাও তাই শুরু করেন। একপর্যায়ে উনি শুরু করলেন রেসলিং করা। বেশি কিছু করতে পারেননি, কিন্তু খেলাটির প্রতি ভালোবাসা ছিল।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর বাবা ফিরে এলেন দেশে। আমাদের পুরনো ঢাকার বাসিন্দা ও অবাঙালিদের মধ্যে তখন একটি ব্যাপার ছিল। প্রতি বাসাতেই কেউ না কেউ হয় রেসলিং, নয় বক্সিং, নয় ওয়েটলিফটিং করত। সদরঘাটে এখন যেটি নবযুগ, তখন সেটি কায়েদে আজম ফিজিক্যাল ট্রেনিং অ্যান্ড কোচিং সেন্টার ছিল। বাবা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বললেন, তুই রেসলিং কর। আমি বললাম, না। ওয়েটলিফটিং কর। না। তাহলে তুই কী করবি? আমি বললাম, বক্সিং।

১৯৬৮ সালের ঘটনা। তখন আমার ১৬-১৭ বছর বয়স। দুটি কারণে বক্সার হতে চাইলাম। এমনিতেই ওই বয়সে বাবাদের কথার অবাধ্য তো ছেলেরা হতে চায়। বাবা রেসলিং-ওয়েটলিফটিং আগে করতে বলায় তাই তা করিনি। আরেক কারণ মোহাম্মদ আলী। তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন—এসব মিলিয়ে তখন তাঁর ভীষণ ক্রেজ। আমিও তাই মোহাম্মদ আলীর মতো বক্সার হতে চাইলাম।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনার প্রিয় কৌশল সম্পর্কে জানতে চাই?
আবদুল হালিমঃ রাইট হুক ও রাইট ক্রস উইথ সাইড স্টেপিং, নাহলে বড় খেলোয়াড়দের হারানো অনেক শক্ত।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনার অনুপ্রেরণা-
আবদুল হালিমঃ এক কথায় “মোহাম্মদ আলী”। উনি বক্সিংয়ের প্রবাদপুরুষ। তিনি একটা যুগের সৃষ্টি করেছেন। আগে বক্সিংটা মারামারির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি এটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যান।

তাঁকে দেখার পর যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল সত্যিই কি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বক্সারের সঙ্গে কথা বলছি? বক্সিংয়ের লেফট ক্রস, রাইট ক্রস শিখেছি তার কাছে। পরে ওভাবে বহুজনকে নকআউট করেছি।

দি টাইমস ইনফোঃ বক্সিং নিয়ে কি বর্তমানে কোনো কাজ করছেন?
আবদুল হালিমঃ বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে চুক্তিতে কোচিং করাই। আগে বক্সিং ফেডারেশনে সদস্য ও যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম। কোচ-নির্বাচকের ভূমিকায় ছিলাম বেশ কয়েক বছর। জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হিসেবেও অনেক বছর দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আর কোথাও নেই।

দি টাইমস ইনফোঃ বাংলাদেশের বক্সিংকে যা দিতে চেয়েছেন তা কি দিতে পেরেছেন?
আবদুল হালিমঃ যে সংসদে যেতে পারে না, সে জনগণের সেবা করবে কিভাবে? আমি ফেডারেশনে নেই, কিভাবে ফেরত দেব। দুই-তিনজন রাঘববোয়াল আমাকে কিংবা মোশাররফকে ডাকবে না কখনো। কারণ ২০ টাকার মোমবাতির পাশে ৫ টাকার মোমবাতির আলো দেখা যায় না।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনার দৃষ্টিতে একজন মুষ্টিযোদ্ধার মানে কি?
আবদুল হালিমঃ রাফ অ্যান্ড টাফ।

নকআউট করছেন আবদুল হালিম

দি টাইমস ইনফোঃ খেলার সময় আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কিভাবে দেখতে পছন্দ করেন?
আবদুল হালিমঃ জীবনে একবারই তৃতীয় হয়েছি। সবসময়ই ছিলাম চ্যাম্পিয়ন। যেবার তৃতীয় হয়েছিলাম প্রথম যে হয়েছিল তারও মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিলাম, তবে নিজে ছিলাম অক্ষত। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নক আউট করতেই ভালবাসি। তবে মারামারি থেকে আমরা সবসময় দূরে থাকি। কারণ আমরা জানি আমাদের শক্তি সম্পর্কে।

দি টাইমস ইনফোঃ খেলার সময় প্রতিপক্ষের কি কি দুর্বলতা বেশী খুঁজতেন?
আবদুল হালিমঃ হেসে… কখন গার্ড সরিয়ে নেয়। সেই চোখের পলকেই আমাকে কাজ সারতে হত।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনার কোন বিশেষত্ব অন্য মুষ্টিযোদ্ধাদের থেকে আপনাকে আলাদা করেছে?
আবদুল হালিমঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আমি চলে আসি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোচিং সেন্টারে। সেখানে কোচ আবদুল মতিনের সঙ্গে পরিচয়। উনি আমার গুরু। আগে জানতাম, বক্সিং খেলা মানে মারামারি। এটি যে একটি শিল্প, তা প্রথম জানি আমার এই কোচের কাছ থেকে।

উনি আমাকে শেখালেন স্পোর্টসম্যান হতে গেলে পাঁচটি ‘এস’ লাগে—স্ট্যামিনা, স্ট্রেন্থ, স্পিড, স্কিল ও সাফলনেস। আর চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে লাগে তিনটি ‘টি’—ট্রেনিং, টেকনিক ও ট্যাকটিকস। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ সব কিছু আমি আয়ত্ত করতে পেরেছি। যে কারণে মাত্র ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার একটা মানুষ হয়েও ৬ ফুট উচ্চতার প্রতিপক্ষকে করেছি নকআউট। এক ঘুষিতে ফেলে দিয়েছি কতজনকে। আর ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ অবধি আমার ওজন ৫১ কেজির ভেতর সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম অনেক সাধনায়। আমি অন্যদের চেয়ে চর্চা করতাম বেশি। তাই এই পাঁচটি এস আর তিনটি টি আমার ছিল সবচেয়ে বেশি, তাই আমি অন্যদের থেকে আলাদা।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনার সফলতা সম্পর্কে জানতে চাই-
আবদুল হালিমঃ আমি ছিলাম সবচেয়ে শক্তিশালী সবসময় চ্যাম্পিয়ন। আমিই প্রথম বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পদক নিয়ে আসি। ৫বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেই আমি বস্ত্রশিল্পের হয়ে চ্যাম্পিয়ন। পরে মেট্রোপলিশ, বিওএম এবং শেষে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ১৯৮০ সালে খেলা ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত ফ্লাইওয়েটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি ৫বার।

বিদেশের মাটিতে পুরষ্কার নিচ্ছেন আবদুল হালিম।

দি টাইমস ইনফোঃ যদি আবার সুযোগ হয় কার সাথে খেলতে চাইবেন অন্তত একটিবার?
আবদুল হালিমঃ “হারি মাহাতু” ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন বক্সার। সেমিফাইনালে ইন্দোনেশিয়ার এই বক্সারের সঙ্গে আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয় ১ পয়েন্টে তাদের মাটিতে। এশিয়ান বক্সিং ফেডারেশনের তখনকার প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের আনোয়ার চৌধুরী ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত।

তাঁকে গিয়ে বললাম, ‘চাচা এটি কী হলো?’ উনি সুন্দর করে বুঝিয়ে জবাব দিলেন, ‘বেটা, হারজিত হয়েছে ১ পয়েন্টের জন্য। ধরলাম না হয় তুমিই জিতেছ। কিন্তু খেলাটি যদি তোমাদের দেশে হতো, তাহলে কী হতো? নিজ দেশের বক্সারকে জিতিয়ে দেওয়া হতো না?’ তাঁর ওই কথার পর আমি শান্ত হয়েছি। কারণ ছিল আমি মারছিলাম অনেক বেশী। তার মুখ বিভিন্ন জায়গায় ফাটিয়ে দিয়েছিলাম। যখন বুঝল সে শুধু মার খাবে রক্ত ঝরবে কিন্তু আর মারতে পারবে না, তখন রেফারির বিশেষ ক্ষমতায় তাকে জিজ্ঞেস করলে সে খেলতে অপারগতা জানায়। এভাবে আমি তৃতীয় হই নয়ত ইতিহাসটা অন্য হত।

মাঝে মাঝে মন চায় যদি কখনো সুযোগ হত তাহলে ওকেই নক-আউট করব। দেখে নেব কে সেরা। আর আমার ছেলে দুঃখ করে বলে বাবা তোমার বক্সিং দেখলাম না। সেই ম্যাচে আমার ছেলেকে রিং এর পাশে রেখে দেখাবো।

দি টাইমস ইনফোঃ বাংলাদেশের বক্সিং নিয়ে আপনার ভাবনা-
আবদুল হালিমঃ আমাদের দেশের ছেলেরা যেন বক্সিং-এ অলিম্পিক সহ সকল ক্ষেত্রে আরও সফলতা নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বক্সিংএর ইতিহাস সকলের জানার জন্য একটি বই লিখছি।

দি টাইমস ইনফোঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। দি টাইমস ইনফোকে সময় দেওয়ার জন্য। ভাল থাকবেন।
আবদুল হালিমঃ আপনাদেরও ধন্যবাদ।

সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন ফয়সাল মাহমুদ।

Share

আরও খবর