৭১ এর গণহত্যা২৭ মার্চ, বিশেষ প্রতিবেদনঃ ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সময় সাংবাদিক মুসা সাদিক জেনারেল টিক্কার এক সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেন। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘When did you exactly start the genocide in Dhaka, Sir?’

জেনারেল টিক্কা নির্বিকারভাবে উত্তর দেন, “আমি কোনো গণহত্যা করাই নি। আমাদের টহলদার বাহিনীর ওপর গোলাবারুদ নিয়ে হামলা করার জন্য জগন্নাথ হলে কিছু অবাঞ্ছিত লোক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরপর আমি জগন্নাথ হলে কিছু সেনা পাঠাই। এটা সত্য যে তাতে কিছু হিন্দু লোক মারা যায়। এরপর কিছু কিছু সংঘর্ষ হয়। তাতে আমাদেরও কিছু লোক মারা গেছে এবং মুক্তিবাহিনীর লোকও মরেছে। সেখানে দু-পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, তা-তো গণহত্যা নয়।”

জেনারেল টিক্কা খানের জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা ভাষণের কোন ক্ষমা হতে পারে না। টিক্কা খান আইখম্যানের চেয়েও বড় গণহত্যাকারী। ‘পাকিস্তানি আর্মির বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ লোক হত্যা’ এ নিয়ে পাকিস্তানে একটি কমিশন গঠিত হয় এবং ‘৭১-এ বাংলাদেশে জেনোসাইড ও রেপ করার সুনির্দিষ্ট কারণে ঐ কমিশন পাকিস্তান আর্মির অনেককে কোর্ট মার্শাল করার জন্য সুপারিশ করে। যদিও তা কার্যকর হয়নি।

কিন্তু ২৬ মার্চ এর পর ঢাকার চিত্র ছিল পুরোই ভিন্ন। চারদিকে লাশ আর লাশ। রক্ত আর রক্ত। এর নিরব সাক্ষী হয়ে আছেন তখনকার কিছু সুইপার। তাদের চোখে পাওয়া যায় পাক বাহিনীর বীভৎসতার চিহ্ন।

সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলী এমনি একজন। ঢাকার ২৬-২৭ মার্চের গণহত্যার এক নীরব প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। তার ওপর ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি থেকে মৃতদেহ সরানোর প্রথম হুকুম আসে জল্লাদ টিক্কা বাহিনীর নিকট থেকে। তিনি কয়েকজন ডোম ও ঠেলাগাড়ি নিয়ে ঢাকার রাজপথ থেকে শত শত লাশ ২৬ ও ২৭ মার্চ ও পরবর্তী দিনগুলোতে সরাবার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, “এত লাশ এক সাথে এ জীবনে দেখিনি। পৌরসভার ডোমরা সেদিন রাস্তায় লাশের পাহাড় দেখে ভড়কে গিয়েছিল।”

সাহেব আলী ২৬ মার্চ ঢাকায় গণহত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বললেন, “২৬ মার্চ সুইপার কলোনির দোতলা থেকে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম ফাঁড়ির প্রবেশপথে, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে ১০ জন পুলিশ। ইউনিফর্ম পরা পুলিশদের সারা শরীর গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। আমি বাবুবাজার ফাঁড়ির ভেতরে ঢুকে দেখলাম ফাঁড়ির চারদিকের দেয়াল হাজার হাজার গুলির আঘাতে ফোকর হয়ে গেছে। দেয়ালের চারদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে। সেখানে দেখলাম বাঙালি পুলিশ কেউ জিভ বের করে পড়ে আছে। কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে। প্রতিটি লাশের শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন। এ রকম শত শত বীভৎস দৃশ্য দেখে একটি ঠেলাগাড়িতে করে আমি ও আমার সাথের ডোমরা মিলে সকল লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশঘরে রেখে আসি। সেখান থেকে ঠেলাগাড়ি নিয়ে শাঁখারী বাজারে প্রবেশ করে একেবারে পূর্বদিকে ঢাকা জজকোর্টের কোণে হোটেল-সংলগ্ন রাস্তায় এসে দশ-বারোজন অসহায় ফকির মিসকিন ও রিকশা মেরামতকারী মিস্ত্রির উলঙ্গ ও অর্ধ-উলঙ্গ লাশ দেখে আঁতকে উঠলাম। সেগুলো সব মুসলমানের লাশ ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশগুলি ঠেলাগাড়িতে তুলে আমরা মিটফোর্ড নিয়ে গেলাম। লাশগুলো আমরা স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি। রাজধানী ঢাকার সর্বত্র কার্ফ্যু থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই বীভৎস দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র-জনতা রাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে এলে পাকিস্তানি সেনারা ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায় কারফিউ বলবত্ রয়েছে। কেউ রাস্তায় বের হলে দেখামাত্র গুলি করা হবে। পাকিস্তানি সেনাদের এ ঘোষণার পর আমরা সরে পড়লাম।”

২৬ মার্চ দিনশেষে তাঁরা ঢাকার যেসব স্থানে যে ডিউটি করেন, তার বর্ণনায় তিনি বলেন, “২৬ মার্চ দিনশেষে বেলা পাঁচটার দিকে তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার এবং কোর্ট হাউস স্ট্রিট এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সাথে সাথে চলতে থাকে বৃষ্টির মতো অবিরাম গুলিবর্ষণ। সারারাত পাকিস্তানি সেনারা তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়ালনগর এলাকায় অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বেলা একটার সময় পাকিস্তানি সেনারা নওয়াবপুর থেকে ইংলিশ রোডের বাণিজ্য এলাকার রাস্তার দু-দিকে সকল দোকানঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। যাদের ঘর থেকে বের হতে দেখেছে, তাদের পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। বেলা তিনটা পর্যন্ত ইংলিশ রোডের রাস্তার দু-দিকে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকে। পালাতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির আঘাতে প্রাণ হারাতে থাকে। বেলা তিনটায় পাকিস্তানি সেনারা তাঁতীবাজারের বাইরের দিকের পথ ও মালিবাগ পুলের পশ্চিম দিকে মন্দিরের ওপর শেলিং করে মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়। ইংলিশ রোডের আগুন সুইপার কলোনির দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে সকল সুইপার মিলে কলোনির পানি রিজার্ভ করে রাখে। পাকিস্তানি সেনাদের ডিঙিয়ে সকল সুইপার মিলে সুইপার কলোনিটি রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এলে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির মুখে পড়ে তারা। ফলে ২৬ মার্চ লাশ তোলা সব বন্ধ হয়ে যায়।”

এর দু-দিন পরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে লাশ তোলার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, “২৮ মার্চ সকালে ঢাকা রেডিওতে সকল সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীকে অবিলম্বে কাজে যোগদানের নির্দেশ প্রচার করে। পরদিন আমি সকাল দশটার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটিতে গেলে ঢাকা পৌরসভার তত্কালীন কনসারভেন্সি অফিসার মি. ইদ্রিস আমাকে অন্য ডোমদের নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন।” তিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বলতে থাকেন “সাহেব আলী বের হয়ে পড়ো। যদি বাঁচতে চাও, তবে এক্ষুণি ঢাকার রাজপথ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তোলার জন্য বের হয়ে পড়ো। কেউ বাঁচবে না, কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। সবাইকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মারবে। সবাইকে কুকুরের মতো খুন করবে।”

৩০ মার্চ এর বর্ণনায় সাহেব আলী বলেন, ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনাদের এক মেজর পৌরসভায় টেলিফোন করলেন। টেলিফোনে তিনি বললেন, ‘রোকেয়া হলের চারিদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে সেখানে বসা যাচ্ছে না। এক্ষুনি ডোম পাঠিয়ে যেন সব লাশ তুলে ফেলা হয় এবং এ জন্য তিন ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়। আমি ছ-জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে রোকেয়া হলের সমস্ত কক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজে কোনো লাশ পেলাম না। অতঃপর চারতলা ছাদের ওপর গিয়ে আঠারো-উনিশ বছরের এক ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখলাম। আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দিয়ে ডোমদের দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসি। সেখান থেকে গেলাম রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে। সেখানে গিয়ে পাঁচজন মালীর স্ত্রী-পরিজনদের পাঁচটি লাশ এবং আটটি পুরুষের লাশ (মালী) পেলাম। লাশ দেখে মনে হলো মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সবাই ঘুমিয়ে ছিল। সে সব লাশ তোলার পর খবর পেয়ে আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ির তেতলা থেকে জনৈক অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের লাশ তুললাম। স্থানীয় লোকজনের মুখে জানতে পারলাম, তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছে। এসব লাশ ট্রাকে করে নিয়ে নির্দেশমতো স্বামীবাগ আউটফলে ফেলে দিলাম।

অতঃপর নির্দেশমতো আমরা ট্রাক নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ সারা দিন ধরে তুললাম। আমরা ৩০ মার্চ ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটফলে ফেললাম। পাকিস্তানি সেনারা কুলি ও শ্রমিক দিয়ে পূর্বেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল। পরের দিন অর্থাৎ ৩১ মার্চ আমরা মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোনির নিকট থেকে সাতটি পচা ফোলা লাশ তুললাম। ইকবাল হলে আমরা কোনো লাশ পাইনি। পাকিস্তানি সেনারা পূর্বেই ইকবাল হলের হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা দশ-বারো জন নর-নারীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ এদিন তুললাম। ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর দিয়ে আসি। সেখানে তরতাজা চারজন ছাত্রের লাশ তুলেছি।

১ এপ্রিল এর বর্ণনায় সাহেব আলী বলেন, ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল আমরা ড্রাম ফ্যাক্টরি, কচুক্ষেত, ইন্দিরা রোড, তেজগাঁও, শেরেবাংলা এলাকাস্থ ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তর, ঢাকা স্টেডিয়ামের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকশ ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। এটা ছিল ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি এলাকা। শুনেছি, তারা মিছিল করে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে মারা পড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কামানের গোলায়। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় থেকে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। গড়ে প্রতিদিন ১৫০টি লাশ তুলেছি আমরা। রায়েরবাজার ইটখোলায় আমরা কয়েক হাজার বাঙালি যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ তুলেছি। অধিকাংশ লাশ ক্ষত-বিক্ষত। পাকিস্তানি সেনারা তাদের ট্রাকে করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তুলে এনে এখানে জড়ো করে। সেখানে মনে হলো মানুষ না, হাজার হাজার মরা ব্যাঙের লাশ তুলেছি। সেদিন আমার ডোমদের বুক কেঁপে গিয়েছিল। তারা বাংলা মদ গিলে কাজ করে। না হলে পারত না কাজ করতে।

মিরপুর এক নম্বর সেকশনের রাস্তার পার্শ্বে ছড়ানো-ছিটানো শত শত বাঙালি যুবকের লাশ তুলেছি। পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় বিহারীরা এদের এখানে এনে কচু কাটা করেছে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে দশজন ছাত্রের ক্ষত-বিক্ষত লাশ তুলেছি। পিলখানা, রায়েরবাজার রাস্তা, গণকটুলি, কলাবাগান, ধানমন্ডি, কাঁঠালবাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষের পচা, ফোলা লাশ তুলেছি। অনেক লাশের হাত-পা পেয়েছি, মাথা পাইনি।

(চলবে…)

Share

আরও খবর