১৪ সেপ্টেম্বর, অনলাইন ডেস্কঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। নামে-বেনামে ভুয়া আইডি খুলে ছড়ানো হচ্ছে ব্ল্যাকমেইলের জাল।

এ ছাড়া ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের আইডি হ্যাক করে দাবি করা হচ্ছে নগদ অর্থ। আর দাবি না মানলে অ্যাকাউন্ট থেকে আপত্তিকর ছবি এবং পর্নোগ্রাফি ছড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাকাররা। অনলাইনে শেখানো হচ্ছে হ্যাক করার পদ্ধতি।

এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাও নতুন না। অনেক সরকারি কর্মকর্তাও ভুয়া আইডি খুলে সরকার প্রধান এবং বিচার বিভাগ নিয়ে ছড়াচ্ছেন আপত্তিকর কার্টুন। বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন তাসনুভা রহমান। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ফেসবুকে লগইন করতে গিয়ে দেখেন বারবারই ‘ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে’ লেখা উঠছে। তিনি বারবার চেষ্টা করেও লগইন না হলে আইডি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালান। এ সময় জানতে পারেন তার আইডি হ্যাক করা হয়েছে। আইডি ফিরে পেতে এবং গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইলে তাকে টাকা পরিশোধ করতে হবে এমনটা জানায় হ্যাকাররা। পরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে অনেক চেষ্টার পর তিনি আইডি উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে হ্যাকার যা ক্ষতি করার তা করে ফেলেছে। তার আইডি থেকে বিভিন্ন বন্ধুদের বার্তা পাঠিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে এবং বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ওই নম্বরে টাকা পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার বিভিন্ন বন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তার স্ক্রিন শট এবং ব্যক্তিগত ছবি।

শুধু ফেসবুকই নয় টুইটার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার, গুগল প্লাস, ইনস্ট্রাগাম, স্কাইপিসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে করা হচ্ছে ব্ল্যাকমেইল। এর মাধ্যমে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনোভাবেই কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের বেশির ভাগ ঘটনার শিকার হচ্ছেন নারীরা তবে নিরাপদ নয় পুরুষরাও। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবে সক্রিয়। এই মাধ্যমটাকেই কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক। এরকম ব্ল্যাকমেইলের অনেক অভিযোগ এসেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের সাইবার ক্রাইম বিভাগে। গ্রেফতার করা হয়েছে অনেককে। তবুও থামছে না অপরাধ। একের পর এক ঘটেই চলেছে এসব ঘটনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, মানুষের মূল্যবোধ, বিবেকবোধের অধঃপতন ঘটছে। আকাশ সংস্কৃতি থেকে যা পাচ্ছে তাই মানুষ গোগ্রাসে গিলছে। হাতের মোবাইলে সারা দুনিয়া চলে আসায় বাংলাদেশে বসে পশ্চিমা ভাবধারা নিয়ে ঘুরছে। এসব অপরাধ বন্ধ করে সামাজিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সঠিক নীতিনির্ধারণ এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারেও নীতিমালা জরুরি।

বাংলাদেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনটি মামলা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হয়। কিন্তু পরের বছর মামলা আসে ৩২টি। ২০১৫ সালে ১৫২টি ও ২০১৬ সালে ২৩৩টি মামলা। আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই এসেছে ১৪১টি মামলা। ট্রাইব্যুনালে এখন ৩৮২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে এসব অপরাধ ঘটলেও অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ছেলেমেয়ে উভয়েই ভুয়া আইডি বানিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। অনেক ছেলে-মেয়েদের নামে আইডি খুলে মেয়ের ছবি দিয়ে চালাচ্ছে পর্নো পেজ। এগুলোতে বাজে গল্প লিখে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে যুব সমাজকে। এ ছাড়া শেয়ার দেওয়া হচ্ছে পর্নোগ্রাফি। এমনকি এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও ভুয়া আইডি খুলে বিভিন্ন রকমের কুরুচিকর মন্তব্য ছড়াচ্ছেন। এসব সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাইবার অপরাধ তদন্তবিষয়ক সেল রয়েছে।

সাইবার অপরাধবিষয়ক কোনো মামলায় বিশেষজ্ঞ মতামত (অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি-না, তা ফরেনসিক পরীক্ষা করে মতামত) দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সিআইডি। ২০১৩ সাল থেকে সিআইডি এই মতামত দিয়ে আসছে। ওই বছর ২৫টি মামলায় বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছে সংস্থাটি। এরপর ২০১৪ সালে ৬৫টি, ২০১৫ সালে ২১৭টি, ২০১৬ সালে ৪১৬টি এবং এ বছরের প্রথম দুই মাসে ৭৫টি মামলায় মতামত দিয়েছে তারা। গত বছর থেকে কাজ শুরু করা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ৪২টি মামলার তদন্ত করছে। আর ২০১৫ সালে দুটি মামলা দিয়ে তদন্ত শুরু করা পিবিআই তদন্ত করছে ২৫টি মামলা। এসব নিয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) পদক্ষেপ নিলেও কমছে না অপরাধ। গত ১৪ আগস্ট ইমো’র মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করায় দুজনকে আটক করেছেন র‌্যাব-৩-এর কর্মকর্তারা। এর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রায় প্রতিদিনই এসব অভিযোগ উঠলেও নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রাইম ঠেকাতে পুলিশে নতুনভাবে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। এ জন্য নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে আমারা আলাদা ইউনিট করার পরিকল্পনা করছি।

Share

আরও খবর