ভূপেন হাজারিকা৫ নভেম্বর, বিনোদন ডেস্কঃ গান যে শুধু শোনারই জিনিস নয়, উপলব্ধির ও বোঝার উপকরন-এটা বুঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তার কিছু সৃষ্টি অবিস্মরণীয়। তার রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন।

এই মহান শিল্পীর ৫ম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর কিংবদন্তিতুল্য এই শিল্পীকে আমরা হারিয়েছি।

‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি রে.. ছুটে ছুটে আয়’, গানে গানে এমন আকুতির কথা ছিল বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার। তার দরাজ কণ্ঠে আরো বেশ কিছু গান মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, যেমন-‘‘বিস্তীর্ণ দু’ পাড়ে’, ‘সাগর সঙ্গমে’, দোলা হে দোলা’, ‘প্রতিধ্বনি শুনি’, ‘আমায় একটা সাদা মানুষ দাও’, ‘শরৎ বাবু খোলা চিঠি দিলেম তোমার কাছে’, ‘গঙ্গা আমার মা-পদ্মা আমার মা’, ‘জীবন নাটকের নাট্যকার কি বিধাতা পুরুষ’-প্রভৃতির জীবন অনুসন্ধানী গান ছিল ভূপেন হাজারিকার। ভূপেনের গান মানুষকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করেছে।

গায়ক, সুরকার ও কবি অনেক গুণে গুণান্বিত তিনি। আবার তিনি রাজনীতিকও। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবতাবাদী। আর মানবতাবাদীদের কাছে তার গান আজ স্লোগান। তিনি ভূপেন হাজারিকা।

জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ,/ জয় জয় মুক্তিবাহিনী / ভারতীয় সৈন্যের সাথে রচিলে / মৈত্রীর কাহিনী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে এই গানটি গেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। বাংলা ও বাংলাদেশের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা ছিল তার। আনন্দবাজার পত্রিকায় এক মন্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের পরই সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসাবে মনোনীত হয় ভূপেন হাজারিকার গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’।

কিংবদন্তি এই কণ্ঠশিল্পীর জন্ম আসামে ১৯২৬ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সেই স্বীকৃতি পায় তার গান। তখন অসমীয়া ভাষায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের জন্য ওই গানটি তিনি গেয়েছিলেন। পরবর্তীতে বাংলা এবং হিন্দি ভাষায় সংগীত পরিবেশন করে উপমহাদেশে নিজের আসন পোক্ত করেন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৭ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী ও ২০০১ সালে পদ্মভূষণ খেতাব জয় করেন ভূপেন হাজারিকা।

১৯৯২ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালে আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার, ২০০১ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার, ২০০৯ সালে আসাম-রদ্ন, ২০০৯ সালে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি অ্যাডওয়ার্ড প্রভৃতি, সেন্সর বোর্ড ও জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

ভূপেন হাজারিকা ছিলেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি ছিলেন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। নিজেকে তিনি ‘যাযাবর` ঘোষণা করেছিলেন। বাংলাভাষীদের কাছে তার জনপ্রিয়তা প্রবাদতুল্য। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কারিগর এই শিল্পীর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো সব প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন এবং অনেক গান গেয়েছেন। ভূপেন হাজারিকার গানে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী সুর উচ্চারিত। ভূপেন হাজারিকা তার সৃষ্টিশীল কর্মের জন্য যুগের পর যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষি জনমানসে তিনি অমর হয়েই থাকবেন।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেও ভক্ত শ্রোতাদের মাতিয়ে যান তিনি। বাংলাদেশের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের বাঁধন ছিল তার।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিয্দ্ধু চলাকালে এই শিল্পীর সঙ্গীত স্বাধীনতাকামী জনগণের মাঝে যে আশার আলো জাগিয়েছিল তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ৩৩টি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন। সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন একাধিক ছবিতে। ভূপেন হাজারিকা ১৯৭৩ সালে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নামে যৌথ প্রযোজনায় ছবিতে কণ্ঠ দেন এবং ১৯৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেন।

বারবার ভীষণভাবে সময়কে ছুঁয়ে দিয়েছেন কিংবদন্তি এই গায়ক। সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে লেখা গানগুলো তাকে বেশি জনপ্রিয় করে। আমজনতার কথা তুলে ধরায় তার গানের মধ্যে জনগণ বারবার নিজেদের খুঁজে পেয়েছে। দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে হাজারিকার সঙ্গী ছিলেন চলচ্চিত্রকার কল্পনা লাজমি। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, `ভূপেন শুধু গায়ক ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান সমাজসংস্কারকও। ভারতের পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন তিনি।

ড. ভূপেন হাজারিকার ৫ম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আজ সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ‘মঙ্গল হোক এই শতকে মঙ্গল সবার’ শীর্ষক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করেছে।
সঙ্গীত সন্ধ্যায় ড. ভূপেন হাজারিকার আমি এক যাযাবর, ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘তোমরা গেইলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধুরে’, মঙ্গল হোক এই শতকে মঙ্গল সবার, আয় আয় ছুটে আয় সজাগ জনতা, চোখ ছল ছল করে ওগো মা, শরতবাবু খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে, মোরা যাত্রী একই তরণীর এবং ইউ আর ইন দ্য সেম বোট ব্রাদারসহ বেশকিছু গান গেয়ে শোনাবেন লিয়াকত আলী লাকী।

এ ছাড়া ভূপেন হাজারিকার ৯০তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ভূপেন হাজারিকার গানের কর্মশালায় প্রায় ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে থেকে বাছাইকৃত ২৫ জনের সমবেত কন্ঠে ‘আজ জীবন খুজে পাবি ছুটে ছুটে আয়’ এবং ঢাকা সাংস্কৃতিক দলের সমবেত কন্ঠে ‘দোলা হে দোলা’সহ বেশ কিছু গান পরিবেশিত হবে।

Share

আরও খবর