স্মৃতিসৌধ২৬ মার্চ, বিশেষ প্রতিবেদনঃ ভয়াল কালরাতের ধ্বংসস্তূপ আর লাশের ভেতরে দিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে পাকিস্তানী হিংস্র শ্বাপদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালী। দীর্ঘ ন’মাস যুদ্ধের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে মহান স্বাধীনতা।

এল শৃৃঙ্খল মুক্তির দিন। আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস । এ ভূভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালীর সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস- মহান স্বাধীনতা। ২৬ মার্চ জাতির বীরসেনানীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা দিন। বাঙালীর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন। ২৬ মার্চ আমাদের গৌরব ও অহঙ্কারের দিন।

পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালী। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এ বদ্বীপের মানুষ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের ৪৫বছর পূর্ণ হল আজ।

২৬ মার্চের সূচনালগ্নে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ বঙ্গবন্ধুর এ স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সর্বব্যাপী পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতি তাদের সর্বশক্তি নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা।

যাদের রক্ত ও সম্ভ্রমের মূল্যে আমরা পেয়েছি মহামূল্যবান এ স্বাধীনতা, তাদের গভীর কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দিন আজ। মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতি আজ উৎসবের পাশাপাশি গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর বেদনায় স্মরণ করবে মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদকে। স্মরণ করবে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তাঁর সহকর্মী জাতীয় নেতাদের।

মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা এবং মানবতাবিরোধী যুদ্বাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে জাতি ৪৬ তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করছে।

নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহান এ দিবসটি পালন করবে বাঙালী জাতি। দেশময় উড়বে লাল সবুজের জাতীয় পতাকা। সকালে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে দলমতনির্বিশেষে সেখানে হাজির হবে লাখো মানুষ।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সরকারী ছুটি। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ পৃথক বাণীতে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও বীরত্বগাথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে দেশবাসী ও প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনন্য গৌরবময় দিন’। ঐতিহাসিক এ দিনে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি আজ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের। আরও স্মরণ করি জাতীয় চার নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক-সমর্থকসহ সকল স্তরের জনগণকে, যাঁদের অসামান্য অবদান ও সাহসী ভূমিকা আমাদের বিজয় অর্জনকে ত্বরান্বিত করে।’

রাষ্ট্রপতি এই মহান দিনে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনকে অর্থপূর্ণ করতে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে এবং স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করতে হবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার সপরিবারে জাতির পিতা হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করেছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচারের রায়ও কার্যকর হবে। স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি এখনও দেশের গণতন্ত্র ও সরকারের অব্যাহত উন্নয়নের ধারা বানচাল করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’ এসকল অপশক্তির সকল অপতৎপরতা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শপথ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে, যাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জিত হয়েছে তাদের শ্রদ্ধা জানান।

একই সঙ্গে তিনি জাতীয় চার নেতা, যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়াও প্রধামন্ত্রী সকল বন্ধুরাষ্ট্র, সংগঠন ও ব্যক্তির প্রতি, যাঁরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অকৃপণ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন উপলক্ষে এবার জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকাসহ নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। রাজধানীতে একত্রিশ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে।

Share

আরও খবর