শহীদ শামসুজ্জামান (বীর উত্তম)দ্বীপ উপজেলা মেঘনা। চারদিকেই মেঘনা ও তার শাখা নদী কাঠালিয়া নদী ঘেরা একটি দ্বীপ। পূর্বে দাউদকান্দি উপজেলার অংশ ছিল বর্তমানে স্বতন্ত্র উপজেলা। এখনও উপজেলাটি ঢাকা থেকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেই সুবিধা বঞ্চিত এলাকা গোবিন্দপুর ইউনিয়নের সোনারচর গ্রাম থেকেই ১৯৭১ সালে উঠে এল এক জাতীয় বীর। হবে নাই বা না কেন? মেঘনা পাড়ের ছেলে। উত্তাল মেঘনায় সাঁতার কেটে বড় হয়েছে যে দামাল ছেলে সে তো ভয় পাবার পাত্র নয়। জাতির প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন দেশমাতৃকা রক্ষায়। নাম তাঁর শামসুজ্জামান। বাবা মো. দৌলত হোসেন। শিক্ষকতা করতেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।মা আয়েতুন নেছা ছিলেন গৃহিনী। শামসুজ্জামানেরা দুই ভাই তিন বোন। শামসুজ্জামান ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে যান। সেখানে তিনি ২৮ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে জেড ফোর্সের অধীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার অন্তর্গত ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন নকশী বিওপিতে গভীর রাতে অ্যাসেম্বলি এরিয়া থেকে এফইউপিতে এলেন দুই কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা কয়েকটি প্লাটুনে বিভক্ত। একটি প্লাটুনে আছেন শামসুজ্জামান। তাঁরা সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্তিশালী একটি ঘাঁটিতে আক্রমণ করবেন। মুক্তিবাহিনীর দুই কোম্পানিতে সেনা মাত্র ২৪-২৫ জন। বাকি সবাই স্বল্প ট্রেনিংপ্রাপ্ত গণবাহিনীর। তাঁরা মাত্র ২৮ দিনের ট্রেনিং নিয়েছেন। নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সবাই নিঃশব্দে ফায়ারবেসে অবস্থান নিয়েছেন। অধিনায়ক আমীন আহম্মেদ চৌধুরী ( বীর বিক্রম )আক্রমণের সংকেত দিলেন। শুরু হল আর্টিলারি ফায়ার। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকলেন। পাকিস্তানিরাও বসে থাকল না। তাদের দিক থেকেও শুরু হল পাল্টা আর্টিলারি ফায়ার। সীমান্তের ওই এলাকাজুড়ে যেন প্রলয় শুরু হয়ে গেল। গোলাগুলিতে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠল। স্বল্প ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা পেশাদার সেনাদের মত কয়েকটি প্লাটুন অত্যন্ত সাহস ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গুলি করতে করতে পাকিস্তানি অবস্থানের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর মধ্যে শামসুজ্জামানও ছিলেন। এমন সময় তাদের ওপর এসে পড়ে পাকিস্তানি একটি আর্টিলারি গোলা। গোলার টুকরার আঘাতে বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। দু-তিনজনের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এতে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন।কিন্তু শামসুজ্জামানসহ আরও কয়েকজন মনোবল হারালেন না। তাঁদের অদম্য মনোবল, সাহস ও বীরত্বে পাকিস্তানিরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে থাকে। শামসুজ্জামান বিওপির ৫০ গজের মধ্যে পৌঁছে গেছেন। হঠাৎ একটি ভূমিমাইনে তিনি শহীদ হন। এই সময় আহত হলেন অধিনায়কসহ মুক্তিবাহিনীর আরও অনেকে। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন সফল হতে পারেননি। শহীদ শামসুজ্জামানসহ অনেক সহযোদ্ধার লাশ সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা উদ্ধার করতে পারেননি। যুদ্ধক্ষেত্র পাকিস্তানিদের অনুকূলে চলে যাওয়ায় তাঁদের পশ্চাদপসরণ করতে হয। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আজকে নতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ সামসুজ্জামানের নাম। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার এই মানুষটি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানানোর দায়িত্ব নেয়নি কেউ। তাঁকে চিনার বা মনে রাখার মত কোন স্থাপনা নেই মেঘনা উপজেলার কোথাও। শামসুজ্জামান তুমি আমাদের ক্ষমা করো। ক্ষমা করো আমাদের হীনতা, দৈন্যতা আর অকৃতজ্ঞ চরিত্রকে।

একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যখন ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলে আসছে আর অন্যদিকে আমাদের উদাসীনতা বঞ্চিত করছে নতুন প্রজন্মকে। বিচ্যুত করছে তাদের। সেই সাথে বিস্মৃত হচ্ছেন শহীদ সামসুজ্জামান এবং তাঁর সাথে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে জাতি হারাবে তাঁর চলার সঠিক পথ; হারাবে গন্তব্যের ঠিকানা। শহীদ সামসুজ্জামান ( বীর উত্তম) কে নতুন প্রজন্মের মাঝে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সরকার, জনগনসহ আমাদের সকলের।

প্রভাষক মাহফুজুল ইসলাম সাইমুম।
এক্সিকিউটিভ এডিটর
দি টাইমস ইনফো ডট কম
তারিখঃ ২৬-০৩-২০১৬।

Share

আরও খবর