৩ সেপ্টেম্বর, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ ঈদুল আজহায় কোরবানিকৃত পশু চামড়া নিয়ে লোকসানের মুখে বিক্রেতারা। লবণের অতিরিক্ত দাম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে চামড়ায় মিলছে না কাক্ষিত মূল্য।

মাঠপর্যায়ের বিক্রেতারা বলছেন, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়া দাম কমিয়েছেন। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, লবণের অতিরিক্ত দাম ও ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর, সবকিছু মিলিয়ে চামড়া বাজারে এমন পরিণতি। তাছাড়া এবার সরকারও কম দাম নির্ধারণ করেছে। তাছাড়া যে লবণের বস্তাপ্রতি সাধারণ দাম ৮০০-১০০০ টাকা, তার বর্তমান দাম ১৪০০-১৫০০ টাকা।

মাঠপর্যায়ের চামড়ার দামের এমন ফারাকের বিষয়ে কথা হয় ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ী। তাদের এ ধরনের অভিযোগ আমরা প্রতিবছর শুনে থাকি। কারণ হচ্ছে, এরা সরকারি কিংবা আমাদের নির্ধারিত দাম কখনো অনুসরণ করে না। আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তো সব সময়ই থাকে। আর আমরা সরকার নির্ধারিত সেই দামেই চামড়া ক্রয় করছি।

তিনি বলেন, আর একটি বিষয় হচ্ছে লবণের দাম অতিরিক্ত; সে কারণে চামড়ায় যতটুকু লবণ দেওয়া হবে, সেই দাম যোগ করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করছে পাইকাররা। কারণ আমরা সাধরণত লবণযুক্ত চামড়া কিনে থাকি। পর্যাপ্ত লবণ থাকা সত্ত্বেও দাম কেন বাড়ছে সেটাই বুঝতেছি না। প্রতিবছর লবণ ব্যবসায়ীরা এ সময় এ রকম কাজ করে থাকে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য।

চামড়ার লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে সাখাওয়াত বলেন, গরু-মহিষ-ছাগল মিলিয়ে চামড়া সংগ্রহে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ লাখ চামড়া। আশা করছি আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মাঠপর্যায়ে একটি গরুর চামড়া গড়ে ৭০০-৮০০ টাকা ক্রয় করলেও পাইকারি বাজারে দাম পাচ্ছে না অধিকাংশ চামড়া বিক্রেতা। বাধ্য হয়ে প্রতিটি চামড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম দামে কিংবা কেনা দামে বিক্রি করছে খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা। সবচেয়ে বেশি লোকসান দিচ্ছে ছাগল বা খাসির চামড়ায়। প্রতিটি চামড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকায় ক্রয় করলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ২০-৩০ টাকায়। এমনকি অনেক পাইকারকে লবণ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে কোনো টাকা ছাড়াই নেওয়ার চেষ্টাও দেখা গেছে।

রাজধানী রামপুরার মহানগর প্রজেক্টের তাকওয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এ বছর ১৫০টি গরুর চামড়া ও প্রায় ৮০টির মতো খাসির চামড়া সংগ্রহ করে খুব অল্প লাভে করেছে। ওই মাদ্রাসার শিক্ষক সলিমু্ল্লাহ রাইজিংবিডিকে বলেন, আমরা দানকৃত কিংবা নামমাত্র মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। সেজন্য লোকসান গুনতে হয় না। তবে প্রকৃত অর্থে চামড়ার দাম নেই। আমরা প্রতিটি গরুর চামড়া ৮০০-৮৫০ টাকা বিক্রয় করলেও আড়তে তা ১০০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।

অন্যদিকে কাপ্তান বাজার এলাকায় চামড়া মূল্য আরো কম দেখা গেছে। ডেমরা, রায়েরবাগ, শনিরআখড়া ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে আসা পশুর চামড়া জমা হয় এখানে। ওইসব এলকায় প্রতিটি চামড়া ৭৫০-৮০০ টাকা বিক্রি হলেও কাপ্তানবাজারের পাইকাররা দাম বলছে ৫০০-৬০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি চামড়ায় ১০০-১৫০ টাকা লোকসান।

অনেক ব্যবসায়ী চামড়ার কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তুলে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করেছে। তারা বলছে, পোস্তা ও হাজারিবাগের আড়তে চামড়ার সরবরাহ কম। তাদের দাবি, এবার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

চামড়ার সংকট কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পোস্তা এলাকায় চামড়ার সরবরাহ কম এ কথা ঠিক। সাধারণত পোস্তা এলাকায় সব সময় ট্রাকের লম্বা লাইন থাকে। এবার সেটা দেখা না যাওয়ার কারণ হচ্ছে এবার কিছু আড়ৎ হেমায়েতপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাধারণ প্রতি বছর চামড়া আড়ৎ হিসেবে হাজারীবাগ ও পোস্তা এলাকায় আসে। তিন ভাগে চামড়া সংগ্রহ হচ্ছে বিধায় অনেকেই বিষয়টি ধরতে পারেনি। তাই চামড়ার সংকট বলে মনে করছে।

এবারে সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকায় গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। যা ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।অন্যদিকে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২৫ টাকা, বকরির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা এবং মহিষের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা।

Share

আরও খবর