বিশ্বব্যাপী রোগের বিস্তার ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ। প্রতি বছর ১ কোটি মানুষরে মৃত্যু এবং ২১.২ কোটি মানুষরে জীবদ্দশায় অসুস্থতার  কারণ উচ্চ রক্তচাপ। উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম ঝুঁকির বিষয় হল খাবারে উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ। সাধারন খাবার লবণের অন্য নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। যেসব গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের সাথে লবণ গ্রহণের সম্পর্ক থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রোগতাত্ত্বিক গবেষণা, বংশানুক্রমিক এবং প্রাণীদের উপর গবেষণা।  মানুষের উপর পরিচালিত রোগতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায় লবণ গ্রহণ সরাসারি রক্তচাপের সাথে সম্পর্কিত এবং যে জনগোষ্ঠী অতিমাত্রায় লবণ গ্রহণ করে তাদের রক্তচাপের গড়ও বেশি। জনসাধারণের মধ্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায় যে, যখন লবণ গ্রহণ কমানো হয় তখন মানুষের রক্তচাপ ও কমে আসে।

যেহেতু বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী অনেক এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে (২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ২১% লোক ভুগছে), তাই বাংলাদেশে লবণ ব্যবহারের বিভিন্ন দিক ও ভবিষ্যতে করণীয় অনুসন্ধান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

লবণের কাজ ও প্রভাব

শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা, স্নায়ুর সংকেত চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং পেশির সংকোচন-প্রসারণ ও বিশ্রামের জন্য লবণের মূল উপাদান সোডিয়াম খুবই প্রয়োজনীয়। শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণগত ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কিডনি। রক্তচাপ কমে গেলে বা খুব বেশি বেড়ে গেলে কিডনি তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু সোডিয়ামের পরিমাণ খুব বেশি বেড়ে গেলে কিডনি সেটা পাম্প করে দ্রুত বাইরে বের করে দিতে পারে না। অতিরিক্ত সোডিয়ামের কারণে শরীরে পানি জমে যেতে পারে। এমন সময়ে শরীরে এক লিটার বাড়তি পানিই হৃদ্যন্ত্রে বাড়তি চাপ ফেলতে পারে, ধমনীতে চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। বাড়তি লবণের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াসহ দীর্ঘমেয়াদে কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

লবণরে উৎস

‘ইন্টারসল্ট’ গবেষণায় দেখা যায় বিশ্বে ৩২টি দেশে লবণ গ্রহণের গড় মাত্রা প্রতিদিন ৯.৯ গ্রাম। উন্নত দেশসমূহে লবণ গ্রহণের সচরাচর মাত্রা প্রতিদিন ৯-১২ গ্রাম। এর মধ্যে ৮০% লবণ আসে প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে। এশিয়া ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে খাবারে বেশিরভাগ লবণ যুক্ত হয় রান্নার সময়, সস ও স্বাদ-গন্ধ বর্ধক উপাদান ব্যবহারে। অল্পমাত্রায় সোডিয়াম লবণ প্রাকৃতিকভাবেই সকল অপ্রক্রিয়াজাত খাবারে বিদ্যমান, তবুও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সময়, রান্নায় বা পাতে লবণ যোগ করা হয়।

লবণ গ্রহণ পরিমাপ

‘খাবারে লবণ গ্রহণ কমানো’ প্রকল্পের কার্যকারিতা বোঝার জন্য মানুষের লবণ গ্রহণের মাত্রা পরিমাপ করা জরুরি। পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতিসমূহ হল:

ক. যতটুকু খাবার খাওয়া হয়েছে তা ওজন করা

খ. কি কি খাবার খাওয়া হয় তা মনে রাখা

গ. খাবার গ্রহণের পূর্বে খাবারে লবণের উপাদান পরিমাপ করা

ঘ. প্রস্রাবে ২৪ ঘণ্টার সোডিয়ামের পরিমাণ পরিমাপ করা যেটি সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি (গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড মেথড) বলে বিবেচিত।

লবণের চাহিদা

আমাদের দৈনিক সোডিয়াম দরকার ১০০০-৩০০০ মিলিগ্রাম। অনেকের মতে ২৪০০ মিলিগ্রামের বেশি নয়। আর সোডিয়ামের এই চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন খাবার লবণ প্রয়োজন বড়দের ক্ষেত্রে মাত্র ৬ গ্রাম বা প্রায় ১ চা চামচ পরিমাণ। শিশুদের কিডনি বেশি লবণ সহ্য করতে পারে না। তাই তাদের প্রয়োজন আরো কম লবণ। এক থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের প্রয়োজন দৈনিক মাত্র ২ গ্রাম বা তিন ভাগের এক চা চামচ,৪ থেকে ৬ বছর বয়সীদের জন্য দরকার প্রায় ৩ গ্রাম বা আধা চা চামচ, আর ৭ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৫ গ্রাম লবণ প্রয়োজন। দশ বছরের বেশি শিশুদের প্রয়োজন বড়দের সমান অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৬ গ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, লবণ গ্রহণের মাত্রা হওয়া উচিত প্রতিদিন ৫ গ্রামের কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেডিসিন ইন্সটিটিউটের মতে, প্রতিদিন ৩.৭৫ গ্রাম লবণ গ্রহণই যথেষ্ট, যদিও যুক্তরাজ্যের ‘কনসেনসাস অন সল্ট এন্ড হেলথ’ লবণ গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে প্রতিদিন ৩ গ্রামে আনতে বলে যা এক তৃতীয়াংশ স্ট্রোক এবং এক চতুর্থাংশ হৃদরোগ কমিয়ে আনতে পারবে বলে আশা করা হয়।

বাংলাদেশের মানুষের খাবারে লবণ গ্রহণ কমাতে কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারণ

সাধারণ মানুষের মধ্যে লবণ গ্রহণমাত্রা ৩০% কমিয়ে আনা বৈশ্বিক লবণ হ্রাসকরণের লক্ষ্য এবং এটি ২০১৩-২০২০ মেয়াদি অসংক্রামক রোগ  প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনার মূল অংশ। সম্প্রতি অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারকর্তৃক গৃহীত বহুমাত্রিক কর্ম পরিকল্পনায়ও এই লক্ষ্য অর্জনের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যদিও বাংলাদেশের মানুষের লবণ গ্রহণের মাত্রা জানা নেই, তবুও যদি আমরা ২০১৩-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ১১ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে থাকি তবে ২০২০ সালের মধ্যে তা কমিয়ে ৭.৭ গ্রাম লক্ষ্য করতে হবে (যা বর্তমান অবস্থা থেকে ৩০% কম)।

বাংলাদেশে লবণ গ্রহণ সংক্রান্ত নীতিমালার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) কর্তৃক প্রণীত খাদ্যাভ্যাস নির্দেশিকায় লবণ গ্রহণ কমানোর ওপর জোর দেয়া আছে। উক্ত নির্দেশিকায় রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার, বেশিমাত্রায় লবণ ও লবণযুক্ত খাবার পরিহার এবং প্রতিদিন লবণ গ্রহণ ৫-১০ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

তথাপি, বাংলাদেশে কিছু নীতিমালা ও কার্যক্রম প্রয়োজন যার মধ্যে খাদ্য জরিপের মাধ্যমে লবণ গ্রহণের পরিমাণ, লবণে আয়োডিন যুক্তকরণের আইন, প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ ইত্যাদি সন্নিবেশিত করা থাকবে।

অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁসমূহকেও এ বিষয়ে সজাগ করতে হবে। এনজিও এবং সুশীল সমাজকে লবণ গ্রহণ কমানোর লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকেও জনসমাজে  ও কর্মস্থলে রক্তসংবহনতন্ত্রের রোগ নিরসনে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

সাধারণ জনগণের কি পরিমাণ লবণ গ্রহণ করা উচিত সে বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে দিক নির্দেশনা দেয়া ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

আমরা যা মনে রাখতে পারি

যেকোন খাবারে লবণ হওয়া চাই পরিমিত। আমরা অনেকেই লবণ দিয়েই খাওয়াটা শুরু করি। লবণ খাই যার, গুণ গাই তার- সেজন্য হয়ত। ফারসিতে লবণকে বলে ‘নেমক’। ‘নেমক’ খেয়ে গুণ না গাইলে হয় ‘নেমক-হারাম’। বাড়তি কাঁচা লবণ বা পাতে লবণ খাওয়া পরিহার করুন। পারলে টেবিল থেকে লবণদানি সরিয়ে রাখুন। এতে লবণ গ্রহণ কমে যাবে শতকরা অন্তত ১০-১৫ ভাগ। অনেকে ভেজে লবণ খান। আসলে এতে কোন লাভ নেই। লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন লবণাক্ত মাছ, চিপস, ক্রেকার্স, লবণাক্ত বিস্কুট, কেচআপ, লবণ-বাদাম, পনির, বেকিং পাউডার ইত্যাদি খাওয়াও কমাতে হবে যথেষ্ট পরিমাণে। ফাস্ট ফুডেও যোগ করা হয় বাড়তি লবণ। ফাস্ট ফুডও তাই পরিহার করুন। বড়ই, তেঁতুল, আমলকি, আমড়া, জলপাই, জাম্বুরা, আনারস, কামরাঙা- এ জাতীয় টক ফল লবণ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করুন। দেখবেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ আর খাওয়া হচ্ছে না।

তথ্যসূত্রঃ IEDCR

Share

আরও খবর