শুরু হল রমজান মাস। এই সংযমের মাসে সঙ্গত কারণেই খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথেই করা উচিৎ। নইলে যেকোন সময় আপনার খাবার পয়জনিং এর কারণ হয়ে যেতে পারে এবং এর পরিনতি মারাত্মকও হতে পারে।

তাহলে একে এড়ানোর সবচেয়ে ভাল উপায় কি? অনেকে বলবেন অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান কিনবো, কেউ বলবেন অর্গানিক খাদ্য কিনবো কিংবা ঘরে তৈরী খাবার খাব আরও কত কি! এগুলো সবই ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সবচেয়ে ভাল উপায় হল যে কোন খাবার কিংবা খাবার রাখার পাত্র স্পর্শের আগে সাবান কিংবা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ভাল করে ধুঁয়ে নেয়া। সাবান দিয়ে বারবার ভাল করে হাত ধোঁয়া হল সংক্রমনের বিরুদ্ধে লড়াই করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

অনেকে আবার বলেন রেস্তোয়ায় খেলে ফুড পয়জনিং হয় – এটা সবসময় সঠিক নয়। যদিও এতে ফুড পয়জনিং এর সম্ভাবনা বেশি। খাদ্য বাহিত অসুখ কত রকমের খাদ্য খেলে হতে পারে ? কাঁচা অঙ্কুরিত ছোলা, আধোয়া ফল ও সবজি, কাঁচা ডিম, কাঁচা মাংস, সমুদ্রের খাদ্য, পাস্তুরিত নয় এমন দুধ এমনকি জুস খেলেও।

কেবল যে প্রানিজ খাদ্য খেলেই জীবাণু ভক্ষন হবে তা নয়, দেখতে নির্দোষ লেটুস পাতার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে ফিতাকৃমি। মাংস ঠিকমত সিদ্ধ করে রান্না করা উচিত, কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ মাংস খাওয়া ঠিক নয়। সব ধরনের শাক-সবজি ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। ডিমও সিদ্ধ করতে হবে ঠিকমত। যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূর্বল, শিশু ও বৃদ্ধদের কাঁচা অঙ্কুরিত বিচি বা ছোলা খাওয়া ঠিক নয়। এ থেকে ইকোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনও হতে পারে।

সবজি বা মাংস কাটার জন্য কোন কার্টিংবোর্ড ভাল ? প্লাস্টিক না কাঠের ?
দুইটি বোর্ডের তুলনায় প্লাস্টিকের কার্টিংবোর্ড বেশি নিরাপদ। কারন প্লাস্টিকের কার্টিংবোর্ডে যেকোন কিছু কাটার পর তা ডিসওয়াশারে দেয়া যায়। তবে কাঠের কার্টিংবোর্ডে কিছু কাটার পর সাবান ও পানি দিয়ে ভাল করে ঘষে পরিস্কার করে তারপর আবার ব্যবহার করতে হবে। শাক-সবজি ও মাংসের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কার্টিংবোর্ড রাখা যেতে পারে।

কাঁচা মাংস গৃহতাপে মেরিনেট করা যায়। কারণ , মেরিনেট কি জীবাণু ধ্বংস করে ?
ঠিক নয় কথাটি। রেফ্রিজারেটরে সব মাংস, সিফুড ও পোলট্রি মেরিনেট করুন। প্রথমে না ফুঁটিয়ে রান্না করা মাংসে মেরিনেট যোগ করবেন না। মাংস ও মেরিনেট পরিস্কার বারকোশে স্থানান্তর করুন, যে ডিশে কাঁচা মাংস আছে সেই ডিশে স্থানান্তর করবেন না।
ফ্রিজে রাখা খাবারের বরফ গলিয়ে বা আংশিকভাবে বরফ গলিয়ে নিলে এরপর আবার ফ্রিজে ঢোকানো কি ঠিক হবে ?
যতক্ষন পর্যন্ত খাবারে বরফের কুচি লাগানো আছে বা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে আছে ততক্ষন পর্যন্ত আবার ফ্রিজে রাখা নিরাপদ। তবে রেফ্রিজারেটরে আবার খাবার রাখলে খাবারের সংযুতি ও ফ্লেবার একটু নষ্ট হয় বৈকি।

অনেক সময় দেখা যায় , শক্ত পনিরের উপর ছাতা জন্মে। তা খাওয়া কি নিরাপদ ?
না কখনই ঠিক নয়। এই অবস্থা হলে সেই ছত্রাকের এক ইঞ্চি গোল করে কেটে ফেলে দিতে হবে। শক্ত ফল ও সবজির ব্যাপরেও তা প্রযোজ্য, যেমন আলু ও আপেল। নরম ফল ও পনিরে ছাতা পড়লে পুরোটাই ফেলে দেয়া উচিত। তবে ছাতা পড়া যেকোন খাবারই ফেলে দেয়া উচতি।

রান্না করা মুরগি ইত্যাদি গৃহপালিত পাখির হাড়ের চারধারে পিতলবর্ণ হলে খাওয়া নিরাপদ। তবে ভেতরের তাপ যদি ৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। রান্নার সময় মজ্জা চুইয়ে পড়ে এমন বর্ণ ধারণ করতে পারে। অস্থিমজ্জা থেকে এই বর্ণটি হয় , যা নিরাপদ। বিশেষ করে মোরগের মাংস হিমায়িত থাকলে এবং রান্নার আগে ডিফ্রস্ট করা হলে এমনটি ঘটে। মিট থার্মোমিটার ব্যবহার করা ভাল। মাংস থেকে ঝোল, পরিস্কার রস বেরিয়ে এলে মাংস পুরোপুরি রান্না হয়েছে বোঝা যায়।

নাক দিয়ে শুঁকে খাবার দুষিত হল কিনা তা বোঝা যায় ?
না । ফুড পয়জনিং যেসব অনুজীব ঘটায় নাক দিয়ে শুঁকে এদের অস্তিত্ব বোঝা যায় না। তবুও খাবার শুঁকে খারাপ লাগলে ফেলে দিন।
উপরের লেখা থেকে অন্তত এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করলেই আপনি ফুড পয়জনিং থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

ডঃ এন কে নাতাশা।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ হেল্‌থ সায়েন্স।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
তারিখঃ ২৯/০৫/২০১৭

Share

আরও খবর