রক্ত আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের আনাচে কানাচে প্রতিটি কোষে রক্ত অক্সিজেন সহ বিভিন্ন পুষ্টিসামগ্রী বহন করে নিয়ে যায়। ফিরে আসার সময় শিরাপথে শরীরের বর্জ্য পদার্থগুলো সাথে করে নিয়ে আসে। আবার রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করাও রক্তের কাজ।

রক্ত জমাট বাঁধার প্রধান রক্ত কনিকার নাম- অনুচক্রিকা বা Platelet। এছাড়া রক্তে ১২ প্রকার রক্ত জমাট বাঁধার রাসায়নিক পদার্থ আছে- যা Clotting Factor নামে পরিচিত। যখন কোন আঘাত বা অন্য কোন কারনে রক্তনালী ফেটে গিয়ে রক্তপড়া শুরু হয় তৎক্ষণাৎ অনুচক্রিকা ও Clotting factor গুলো একের পর এক জটিল জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়, রক্ত জমাট বাঁধে এবং রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হয়। অনুচক্রিকা বা এই ফ্যাক্টর গুলোর কোনটার ঘাটতি থাকলে বা অকার্যকর হলে রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না, ফলে রক্ত ক্ষরণজনিত রোগ হয়। ঘাটতির তারতম্য ভেদে এই রোগের মাত্রা অল্প থেকে গুরুতর মাত্রার হতে পারে।

রক্ত ক্ষরণজনিত রোগ বিভিন্ন কারনে হতে পারে। কারো কারো জন্মগত কারনে, আবার কারো কারো অন্য রোগের জটিলতা হিসেবে রক্ত ক্ষরণ হয়। যে কোন বয়সে এই রোগ প্রকাশ পেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী বহুল পরিচিত রক্তক্ষরণ রোগ হল- হিমোফিলিয়া। জন্মগতভাবে রক্ত জমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় Clotting Factor ঘাটতির কারনে এই রোগ হয়। হিমোফিলিয়া দুই ধরনের- হিমোফিলিয়া- এ এবং হিমোফিলিয়া- বি। হিমোফিলিয়া-এ হয় ফ্যাক্টর ৮ এর ঘাটতি থাকলে আর হিমোফিলিয়া- বি হয় ফ্যাক্টর- ৯ এর ঘাটতি থাকলে। অধিকাংশ হিমোফিলিয়া রোগী হিমোফিলিয়া- এ গোত্রের।

লিঙ্গ নির্ধারনী এক্স ক্রোমোজোমে বিশেষ ত্রুটির কারনে এ রোগ দেখা দেয়। নারীরা এ রোগের বাহক এবং পুরুষ এ রোগের ভুক্তভোগী। ছেলে শিশু মায়ের কাছ থেকে এ রোগের জন্যে দায়ী ত্রুটিপূর্ণ ক্রোমোজোম পায়। এই ত্রুটির মাত্রানুযায়ী রোগীর বিভিন্ন মাত্রার রক্তক্ষরণ হয়।

সারা পৃথিবীতে প্রতি ৫০০০ ছেলে শিশুর ১ জন হিমোফিলিয়া নিয়ে জন্মায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮,০০০ হিমোফিলিয়া রোগী আছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন হিমোফিলিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম গ্রহন করে। আমাদের দেশে এ ধরনের হিসেব না থাকলেও অনেক হিমোফিলিয়া আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও হিমোফিলিয়া আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন সেবা দেয়ার জন্যে হিমোফিলিয়া Society বা সংগঠন আছে।

জন্মগত কারন ছাড়াও অন্যান্য রোগে রক্তক্ষরণ সমস্যা হতে পারে। যেমন- লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিউর, ভিটামিন- সি বা ভিটামিন- কে-র ঘাটতি, ডেঙ্গু, ইবোলা ভাইরাস সংক্রমনে, গুরুতর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমনে, রক্ত ক্যান্সারে, কিছু ওষুধ যেমন রক্ত পাতলা করার ওষুধ, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধে, আবার কিছু বিরল রোগ যেমন- SLE, Vasculitis ইত্যাদিতে এ রোগ হয়। অনেক সময় অজানা কারনে অনুচক্রিকা ধংস হয়ে গিয়ে এ রোগ হয় যা ITP নামে পরিচিত।

স্বতঃস্ফূর্ত বা সামান্য আঘাতে রক্তক্ষরণ হওয়া কিংবা কেটে গেলে সহজে রক্ত জমাট না বাঁধা এ রোগের প্রধান উপসর্গ। রোগের প্রকার ভেদে বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষরণ হয়। যেমন হিমোফিলিয়াতে জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে অথবা মাংশপেশিতে, তেমনি অন্যান্য রোগে চামড়ার নিচে অযথা রক্ত জমাট বেঁধে যায়, কখনো কখনো দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে হঠাত রক্ত পড়তে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে মহিলাদের মাসিকের সময় অত্যধিক রক্তপাত হতে পারে। রক্ত ক্ষরণ সমস্যা মাত্রাতিরিক্ত হলে শরীরের অভ্যন্তরে বিশেষ করে মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরনের ফলে মৃত্যুও হতে পারে।

এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসক রোগের বিবরণ শুনে, শরীর পরীক্ষা করে, বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ ও রোগের মাত্রা নির্ণয় করেন। সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। হিমোফিলিয়া রোগীও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। এমনকি যে কোন জটিল অপারেশান পর্যন্ত করতে পারে।
হিমোফিলিয়া বাদে অন্য রক্তক্ষরণ রোগের সরাসরি কোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।

জেনেটিক কাউন্সেলিং করে চিকিৎসকেরা হিমোফিলিয়া রোগ বাহক পরিবারকে বা দম্পতিকে এই রোগ যাতে পরবর্তী প্রজন্মে না ছড়ায় তার উপদেশ বা ব্যবস্থা শিখিয়ে দিয়ে থাকেন। হিমোফিলিয়া আক্রান্ত পরিবারে অনাগত শিশু এ রোগে আক্রান্ত কিনা বা আক্রান্ত হলে সমস্যার মাত্রা কতটুকু গর্ভাবস্থায় তা নির্ণয় করা যায়।

রক্ত ক্ষরণ সমস্যা স্বল্প মাত্রা থেকে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয়ে জীবন হানিও হতে পারে। তাই সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে সব রোগের যথাযথ চিকিৎসা নেয়া উচিত, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া উচিত। পরিবারে হিমোফিলিয়া রোগ থাকলে হতাশ না হয়ে রক্ত রোগের চিকিসকের কাছ থেকে যথাযথ চিকিৎসা ও সঠিক পরামর্শ নেয়া উচিত।

ডঃ এন কে নাতাশা।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ হেল্‌থ সায়েন্স ।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
১৩-০৪-২০১৭।

Share

আরও খবর