ইভলিনসুপার মডেল হতে অসাধারণ সৌন্দর্য এবং সঙ্গে আরও অনেক কিছু- নির্দিষ্ট সহজাত দক্ষতা, নির্ভুল ফ্যাশন প্রবৃত্তি, কঠোর স্থিতিস্থাপকতা, আবেদনময়ী থাকা দরকার। পাশাপাশি একজন মডেল যখন পুরো একটি যুগকে তার নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আর সুপারমডেল নির্দিষ্ট একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে।

এটা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা যখন কেউ একজন সুপার মডেল হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি হলেন ইভলিন নেসবিট (১৮৮৪ – ১৯৬৭) যিনি ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার কপার-কেশী এক সুন্দরী মডেল।

তিনি ছিলেন আমেরিকার সোনালী যুগের চিত্রশিল্পী এবং ফ্যাশন মডেলদের কাছে চরম চাওয়া পাওয়ার। তার জীবন ছিল খুবই ঘটনাবহুল। তার খ্যাতি শীর্ষে উঠেছিল যখন তিনি একটি খুনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং এ নিয়ে সে সময় ‘দ্য ট্রায়াল অব দ্য সেঞ্চুরি’ রচনা করা হয়।

কিন্তু শুধু এভাবে নয়, নেসবিট আলোচনায় আসার আরও অনেক ঘটনা আছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ ছিল আমেরিকার অর্থনীতির দ্রুত ঊর্ধ্বগতির জন্য একটি চমৎকার সময়। কিন্তু একই সময়ে অনেক দরিদ্র ইউরোপীয় অভিবাসী এখানে চলে আশায় সে দেশের মানুষ চরম দুর্দশাও দেখেছেন। তিনি তার জীবদ্দশায় উভয়ই পেয়েছেন।

স্কটিস-আইরিশ বংশোদ্ভূত নেসবিটের ছোটবেলা কেটেছিল পেনসিলভেনিয়ার ট্যারেনটামে। অনেক ঋণ রেখে তার বাবা মারা যান তারা যখন ছোট ছিল। সে সময় তার মা তাদের পরিবারের হাল ধরেন।

নেসবিট কিশরী বয়স থেকেই পরিবারের দারিদ্রতা দূর করার জন্য কাজ শুরু করেন। ১৪ বছর বয়স থেকে তিনি চিত্রশিল্পীদের জন্য সম্পূর্ণ পোশাকে মডেলিং করতেন। ১৯০০ সালে নিউইয়র্ক এসে তিনি অনেক উন্নতি করেন তবে তা ছিল বেশ ক্ষণস্থায়ী।

সে সময়ের একজন শিল্পী জেমস ক্যারল বেকউয়িথ নেসবিটকে তার মালিক জন জ্যাকব অ্যাসটরের কাছে নিয়ে যান। তিনি পরে নেসবিটকে তার সকল চারুশিল্পী এবং অঙ্কন শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এভাবে আস্তে আস্তে নিউইয়র্কের সবচেয়ে চাহিদাপূর্ণ মডেল হয়ে যান তিনি। অসংখ্য শিল্পকর্মের জন্য তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। এর মধ্যে রয়েছে ভাস্কর জর্জ গ্রে বার্নার্ডের বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ইনোসেন্স’ (বর্তমানে মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত) এবং চার্লস ডানা গিবসনের ‘উইম্যান: দ্য ইটার্নাল কুয়েসশন’ (১৯০৫)।

বিভিন্ন জার্নাল এবং ম্যাগাজিনের কভার পেজে তিনি ছিলেন এক জনপ্রিয় মুখ। তাকে প্রায়ই বিভিন্ন বিজ্ঞাপণে- যেমন মুখে মাখার ক্রিম থেকে টুথপেস্টসহ নানা রকম বিজ্ঞাপনে খুঁজে পাওয়া যেত।

নেসবিটের কোমল এবং আবেদনময়ী চেহারা ক্রমেই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে আর তা দেখা যেতে থাকে পোস্টকার্ড, টোবাকো কার্ড, ক্যালেন্ডারের পাতায় এবং ক্রোমোলাইটোগ্রাফে।

এর মধ্যে ছিল কাঠের জলপরী, জিপসি, গ্রীক দেবতা, জাপানি বাঈজী নারী – সবক্ষেত্রেই তিনি পোশাক পরিহিত থাকতেন এবং এর ফলে অঙ্কিত ছবিগুলোতে স্পষ্ট যৌনতা প্রকাশ পেত না। সেগুলো যদিও বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল কিন্তু নেসবিটের জনপ্রিয়তা ও সুখ্যাতি নিয়ে কোন সন্দেহ ছিল না।

ফটোগ্রাফিতে সদ্য যোগদান করা জোয়েল ফেডেরের মাধ্যমে তিনি প্রথম এই মিডিয়ামে একজন ‘লাইভ মডেল’ হিসেবে আসেন এবং তৎক্ষণাৎ তা হিট করে। ফটোগ্রাফির ঊর্ধ্বগতির জন্য ধীরে ধীরে তা ছাপানো অঙ্কিত চিত্রকর্মকে পিছনে ফেলে আসতে থাকে এবং একই সঙ্গে নেসবিটের ছবি পত্রিকায় অনেক বেশি বেশি আসতে থাকে যার ফলে জনগণের কাছে তার পরিচিতিও বাড়তে থাকে।

সুপারমডেল হিসেবে সফল নেসবিট যেন সেই যুগের এক প্রতিমূর্তি এবং ক্রমেই তিনি সেই যুগকে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেন। পউলা উরুবুরু নামের একজন লেখক নেসবিটকে নিয়ে লেখা জীবনী ‘অ্যামেরিকান ইভ’ এ উল্লেখ করেন, ‘বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নেসবিট ছিলেন একজন অ্যামেরিকান ড্রিম গার্ল যার মুখমণ্ডল ছিল তার ভাগ্য এবং তার জীবনের প্রতিফলন ঘটেছিল সে যুগের মাতাল, ঊর্ধ্বগামী এবং দু:সাহসিক মনোভাবে… তিনি পরস্পরবিরোধী প্রেরণাসমূহকে [সেই সোনালী যুগের] বাস্তবরূপে উপস্থাপন করেন; সেসময়ে তার মধ্যে ভিক্টোরিয়ান মনোভাব দেখা যায়, কিন্তু তার মনোমুগ্ধকর হাসিতে যেন লুকানো এক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।’

# খ্যাতি যখন বিপত্তি
ইভলিন নেসবিট যখন ‘ফ্লরোডোরা গার্ল’ নামে খ্যাত তখন নিউইয়র্কের আর্কিটেক্ট স্ট্যানফোর্ড হোয়াইটের সাথে তার পরিচয় হয়। হোয়াইটের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন, টিফানি’স, ওয়াশিংটন স্কয়ার আর্ক এবং কর্নেলিয়াস ভ্যান্ডারবিল্ট’স ম্যানশন। শুরুতে হোয়াইটের সাথে নেসবিটের সম্পর্ক ছিল মামার মতো কিন্তু ক্রমেই তিনি তার প্রেমিক বনে যান এবং তার উপকারী বন্ধুতে পরিণত হন।

তিনি তাকে ও তার পরিবারকে চমৎকার উপহার ও বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট উপহার দেন। প্রায় এক বছর সম্পর্কের পর নেসবিট সম্পর্কের ইতি টানেন এবং মিলিয়নিয়ার হ্যারি কে. থউকে বিয়ে করেন। কিন্তু থউ পরে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এক অনুষ্ঠানে স্ত্রীর সাবেক-প্রেমিক হোয়াইটকে গুলি করে হত্যা করেন।

আদালতে থউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু আমেরিকার ইতিহাসে এমন জনপ্রিয় একজন মডেল হিসেবে নেসবিটকে বিবেচনায় রাখা হয়।

অভিমানি নেসবিট পরবর্তীতে নিজের মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে আসেন এবং ব্যথিত এই ঘটনার পর একজন সন্তানের মা হিসেবে, একজন অভিনেত্রী, একজন বিচিত্র অনুষ্ঠানের অভিনেত্রী হিসেবে তিনি তার জীবনটি সম্পূর্ণ নিজের করে নেন।

তিনি আজও সকলের মাঝে বেঁচে আছেন নানা চিত্রকর্ম ও ছবির মধ্য দিয়ে। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে নানা কবিতা। ১৯৫৫ সালে তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র ‘দ্য গার্ল ইন দ্য রেড ভেলভেট সুয়িং’ নির্মাণ করা হয়।

ই.এল. ডক্টরউ ‘র‍্যাগটাইম’ নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন যেখানে তাঁর খুনের ঘটনাটি বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। এমনকি সম্প্রতি ২০১০ সালে প্রচারিত এইচ.বি.ও. টিভি চ্যানেলে ‘ব্রডওয়াক ইম্পায়ার’ নামে একটি টিভি সিরিজের গিলিয়ান চরিত্রটি নেসবিটের উপর ভিত্তি করে বানানো।

নেসবিটের কৃতিত্ব আজও বেঁচে আছে এবং থাকবে।

Share

আরও খবর