Mature woman with headache

প্রথমবারের মত কোন মেয়ের মাসিক (period) হওয়া একটি মেয়ে কিশোরীতে রূপান্তর বলা যায়। এই নারীতে পদার্পণের সাথে জড়িয়ে থাকে আরও কিছু ঘটনা; যেমন- শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন। তারপর সেই মেয়েটি একসময় বউ হবে, মা হবে। জীবনের যাতাকলে পড়ে একসময় আবিস্কার করবে দিন তো চলে গেল, আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে সুষমা। শারীরিক পরিবর্তনের একটা সময়ে মাসিক বন্ধ হয়ে যাবে যাকে আমরা বলি মনোপজ বা ঋতুবন্ধ। একটি মেয়ের জীবনে এই ঘটনা প্রবাহ একেবারেই সাধারণ। কেউ চাক আর না চাক মেনোপজ হবেই। তাকে হয়ত কিছুদিন বিলম্বিত করা যাবে কিন্তু এড়ানো যাবেনা। তবে এইসব ঘটনা কি এমনিতেই ঘটে? না। আসলে মেয়েদের শরীরে মেয়েলী হরমোন এর তারতম্যে এই শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। কিশোরী বয়সে যখন হরমোন এর প্রভাবে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় তেমনি জীবনের শেষের দিকে এই হরমোনের অভাবে মনোপজ হয়। সাধারণত পুরো এক বছর যদি ঋতুবন্ধ থাকে তাহলে আমরা মেনোপজ বলি। অনেক সময়ই নানা কারনে ঋতুবন্ধ(Amenorrhoea) থাকতে পারে। কিন্তু মোটামুটি ৪০ বৎসর এর পরে যদি এক বছর ঋতুবন্ধ থাকে তাকে মেনোপজ বলে।

মেনোপজের আগের কিছুটা সময়কে বলে পেরি মেনোপজ। যদিও এর কোন সঠিক সীমারেখা বা বয়সের মাপকাঠি নেই। তবে কিছু উৎসর্গ দিয়ে একে চিহ্নিত করা হয়। যেমন- অনিয়মিত বা ওল্পো মাশীক হওয়া এবং অনেক দিন পর পর হওয়া। FSH হরমোনটি এসময় বাড়তে থাকে। মজার কথা এই যে মেয়েদের হরমোন ইস্ট্রোজেন (Oestrogen) এর সাথে FSH এর সম্পর্ক উল্টো। মেয়েদের স্বাভাবিক জীবনের ইস্ট্রোজেন বেশি থাকে তখন FSH কম থাকে। কিন্তু জতই মেনোপজের দিকে একজন নারী এগিয়ে যাবে FSH ততই বেড়ে যাবে। অনেক সময় আমরা এটাও বলে থাকি যদি কোন একটি মাত্র পরীক্ষা করে বলে দেয়া যায় তার মেনোপজ হচ্ছে কি না তা হল FSH লেভেল পরীক্ষা(>25।U।L)

মেনোপজ কে আমরা সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি- স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম।

স্বাভাবিক মেনোপজঃ
মেয়েরা যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখনই তাদের ডিম্বাশয়ে (Ovary) প্রায় ৭০ লক্ষ ডিম থাকে। জন্মের সময় তা কমে গিয়ে ১০-১২ লক্ষে পৌঁছায়। আর কিশোরী বয়সে তা ৩-৫ লক্ষ হয়। প্রকৃতপক্ষে তৈরী হওয়ার পর থেকেই ডিমগুলো সংখ্যায় কমতে থাকে। পূর্ণ বয়স হলে যখন মাসিক শুরু হয় তখন প্রত্যেক মাসে একটি ডিম ফুটে(Ovulation)। অনেক ডিম না ফুটেই নষ্ট হয়ে যায়। মাত্র ৪০০-৫০০ ডিম সারা জীবনে ফুটে থাকে। এই ডিম থেকেই মেয়েদের হরমোন তৈরি হয় তাই যতই মেনোপজের দিকে এগানো যায় ততই হরমোন কমতে থাকে এক পর্যায়ে শূন্য হয়ে যায়। অথবা যেগুলো থাকে সেগুলো কাজ করেনা।

মেনোপজ সাধারণত ৫০-৫১ বছরে হয়ে থাকে। এই মেনোপজ কিন্তু মাসিক , বিয়ে, বাচ্চা হওয়া, ওজন অথবা পিল খাওয়া কোন কিছুর উপর নির্ভর করেনা। যদি ৪০ বৎসরের আগে মনোপজ হয় তাহলে তাকে বলে POF (Premature Ovarian Failure)। আমরা সে প্রসঙ্গে যাচ্ছিনা। তাছাড়া এর কোন সারবিক কারণও জানা নেই । শতকরা ১% মহিলার ক্ষেত্রে এমন হতে পারে।

কৃত্রিম মেনোপজঃ যদি অপারেশন করে ২টি ওভারী (Ovary) বা ডিম্বাশয় ফেলে দেয়া হয় অথবা তেজস্ক্রিয় রশ্মি, কেমোথেরাপী অথবা কোন কারনে ডিম্বাশয়ের রক্ত সঞ্চালন কমে যায় তাহলেও মেনোপজ হতে পারে।

মেনোপজ হবার ফলে শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ঘাটতি অথবা আধিক্য ঘটে। পুরুষ হরমোন (Androgen) প্রায় শতকরা ৫০% কমে যায় কিন্তু ইস্ট্রোজেন বেশি কমাতে এন্ড্রোজেনের কিছুটা আধিক্য হয় তার ফলে মেনোপজের পরে অনেক মহিলার কিছু দাড়ি গোঁফ এর আধিক্য দেখা যায়।
মেয়েদের হরমোন ইস্ট্রোজেন অনেক কমে যাওয়ায় বার্ধক্যের ছাপ দেখা যায়। চামড়া কুচকে যায়, লাবন্য নষ্ট হয়ে যায়, হাড় নরম হয়ে যায় এবং হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অনেকে এজন্য কৃত্রিম ইস্ট্রোজেন নিয়ে থাকে তাদের এইসব উৎসর্গ কিছুটা কম হয়। শীর্ণ মহিলাদের থেকে মোটা মহিলাদের মেনোপজের উৎসর্গ কম হয়ে থাকে কারণ বেশি ওজনের মহিলাদের শরীরের চর্বির মধ্যে ইস্ট্রোজেন জমে থাকে তাই অনেক সময় দেখা যায় এদের অনেক দিন পর্যন্ত হরমোনের প্রভাব থাকে। তবে অতিরিক্ত ওজন কখনই ভাল নয়। এই ওজনই অন্য রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শারীরিক পরিবর্তন এভাবে হতে পারেঃ

প্রজননতন্ত্রে ইস্ট্রোজেনের অভাবে যোনীপথ শুকিয়ে যায় বা শুস্ক হয় এবং প্রদাহ ও ইনফেকশন হয়। মেনোপজের সময় শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নানা ধরণের অসুখ হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার সময় ব্যথা অনুভব হয়। জরায়ু ও জরায়ুর মুখও শীর্ণ হয়ে যায়, এতে অবশ্য একটাই লাভ হয় যদি কারও জরায়ুতে আগে থেকে টিউমার থাকে তবে তা কমে যায়। এক্ষেত্রে অনেক সময় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়না। এছাড়া এসময়ে হরমোনের অভাবে জরায়ু নীচে নেমে যায়। প্রসাবে প্রদাহ হয়ে ঘন ঘন ইনফেকশন মানে জ্বালা-পোড়া হয়। তাই প্রসাবের ইনফেকশনের চিকিৎসায় হরমোন যোগ করলে রোগী তাড়াতাড়ি ভাল হয়।

প্রতিকার ও চিকিৎসাঃ

মেনোপজ হলেই যে জীবন শেষ হয়ে যায়, নারীত্ব শেষ হয়ে যায় তা নয়। রোগীকে বোঝাতে হবে একজন মহিলার জীবনের এক তৃতীয়াংশ বা বেশি সময়ে মনোপজে কাটাতে হয়। তাই এই সময়টাকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।
স্বাভাবিক হাঁটাচলা কাজ কর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। নিয়ম করে দুবেলা হাঁটতে হবে। এসময় হরমোনের অভাবে মহিলাদের কিছুটা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয়ে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কাজেই পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে স্বামীর ভুমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। স্বামীকে সহানুভুতিশীল হতে হবে, স্ত্রীকে সময় দিতে হবে সেই সঙ্গে গুরুত্বও দিতে হবে।

শারীরিক উৎসর্গ প্রথমেই হট ফ্লাশের কথা বলি। হট ফ্লাশ মানে হচ্ছে হঠাত করে গরম লাগা অথবা ঠান্ডা লাগা। অতিরিক্ত ঘাম হওয়া কিংবা অস্থির লাগা। এজন্য হরমোন ক্লোনিডিন গ্রুপের ঔষধ এবং কিছুটা ঘুমের ঔষধ বেশ ভাল কাজ করে। অনেক সময় রোগী চিকিৎসকের কাছে হট ফ্লাশ নিয়েই প্রথম রিপোর্ট করে।

ব্যথাযুক্ত সহবাসঃ
বিশেষত যোনীপথের শীর্ণতার কারণে সহবাসে ব্যথা হয়ে থাকে। এতে হরমোন খাওয়া এবং ক্রিম হিসেবা ব্যবহার এবং কিছু লুবরিকেন্ট ব্যবহারে ব্যথা প্রশমন করা যায়।

হাড় ক্ষয়ে যাওয়াঃ
মেনোপজে এটা একটা মারাক্ত্বক রকমের জটিলতা। শরীরের হাড় শক্ত থাকার জন্য ক্যালসিয়ামের সাথে হরমোন(ইস্ট্রোজেন) অপরিহার্য। তাই হরমোনের অভাবে শরীরের হাড় দুর্বল হয়ে ক্ষয় হয়ে যায়। এর ফলে সহজেই হাড় ভেঙ্গে যায়। এজন্য মাঝে মধ্যেই BMD নামক একটা পরীক্ষা করানো দরকার। এতে শরীরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ পরিমাপ করা যায়। প্রথমে Osteopenia এবং পরে Osteoporosis দেখা দেয়। কাজেই ৩০ বছরের পর থেকেই নিয়মিত ক্যালসিয়াম খাওয়া দরকার।

দৈনিক অন্তত ১২০০-১৫০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম খাওয়া উচিত। যেখানে একটা ক্যালসিয়ামের বড়ি সাধারণত ৫০০মি.গ্রাম হয়। কাজেই ৩ টি না হলেও কমপক্ষে ২টি ক্যালসিয়াম বড়ি খাওয়া যেতে পারে। অনেকের ভুল ধারনা থাকে হরমোন খেলে ক্যান্সার হয়। এটা ঠিক নয়। প্রথম ৫ বৎসর কোন খারাপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই হরমোন খাওয়া যেতে পারে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।

এছাড়া মেনোপজের সময় ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খাওয়া খুবই জরুরী। মেনোপজের সময় খাদ্যাভাসের কিছুটা পরিবর্তন দরকার। সহজপাচ্য খাবার খাওয়া ভাল, নিয়মিত হাঁটাচলা, খাদ্যগ্রহন, বিশ্রাম শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। যাদের ডায়াবেটিস আছে মেনোপজে তাদের জটিলতা বেশি দেখা যায় তাই সামান্য অসুবিধা হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মনোপজের সময় শারীরিক প্রতিরোধ কিছুটা কমে যাওয়াতে নানা ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে তার জন্য নিয়মিত হেলথ চেকআপ জরুরী। এতে অনেক মারাত্বক রোগ প্রাথমিক অবস্থাতেই ধরা পড়ে। অবশেষে এটাই বলা যায় ঋতুবন্ধ বা মেনোপজ মানেই জীবন শেষ হওয়া নয় এটা জীবনের একটা পরিবর্তন। একে হাসিমুখে মেনে নেওয়া ও করণীয় কাজগুলো ঠিকমত করলে জীবনটা সুন্দর ও অর্থবহ হতে পারে।

অধ্যাপক মেজর (অব.) ডাঃ লায়লা আরজুমান্দ বানু
এমবিবিএস(ঢাকা), ডিজিও(ডিইউ), এফসিপিএস(অবস ও গাইনি) এফআইসিএস
চিফ কন্সাল্ট্যান্ট, অবস এন্ড গাইনি
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল ঢাকা।
তারিখঃ ০৯/০৩/২০১৬

Share

আরও খবর