মাশরাফি৫ অক্টোবর, স্পোর্টস ডেস্কঃ যার সন্তান ও নিজের জন্মদিন একই দিন হয়, সেই ব্যাক্তি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম ভাগ্যবান। সাত শতাধিক কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে তাদের সংখ্যাটা গণনা করা সম্ভব। এমন ব্যতিক্রম ভাগ্যবান একজন যোদ্ধার নাম মাশরাফি বিন মর্তুজা।

অসম্ভব ভালো মনের এই মানুষটি ১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর যশোর জেলার নড়াইলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার জন্মের ঠিক ৩১ বছর পর ২০১৪ সালের ৫ অক্টোবর ঘর আলো করে জন্ম নেন মাশরাফির দ্বিতীয় সন্তান সাহেল। আজ বাপ-বেটার জন্মদিন।

মাশরাফি বিন মর্তুজার অনেক জন্মদিন কেটেছে মাঠে। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করে। তবে এবার তার জন্মদিনটা অন্যরকমই বটে। কারণ, খেলা নেই। তার উপর লঙ্গার ভার্সন ‘ওয়ালটন ১৭তম জাতীয় ক্রিকেট লিগেও’ খেলছেন না। তার ছেলের প্রথম জন্মদিন আজ। যেটা কিনা একই দিনে। তাই বাংলাদেশের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের এই জন্মদিনটা আর দশটা জন্মদিনের চেয়ে ভিন্নই হবে।

তবে ছেলের প্রথম জন্মদিন হওয়ার কারণে হয়ত তার জন্মদিনটা ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু একই দিনে বাপ-বেটার জন্মদিন, বিষয়টা ভাবতেই ভাল লাগবে তার।

১৯৮৩ সালে নড়াইলে জন্ম নেওয়া মাশরাফির ছেলেবেলা কেটেছে চিত্রা নদীর তীরে দস্যিপণা করে। তার ডাক নাম কৌশিক। ছেলেবেলায় অবশ্য তার প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাঁধাধরা পড়াশোনার পরিবর্তে ফুটবল আর ব্যাডমিন্টন খেলতেই বেশি পছন্দ করতেন, আর মাঝে মধ্যে চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটা। তারুণ্যের শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে, বিশেষত ব্যাটিংয়ে। যদিও এখন বোলার হিসেবেই তিনি বেশি খ্যাতি অর্জন করেছেন।

বাইক প্রিয় মর্তুজাকে সবাই খুব হাসিখুশি আর উদারচেতা মানুষ হিসেবেই জানে। প্রায়শঃই তিনি বাইক নিয়ে স্থানীয় ব্রিজের এপার-ওপার চক্কর মেরে আসতেন। নিজের শহরে তিনি প্রচন্ড রকমের জনপ্রিয়। এখানে তাকে ‘প্রিন্স অব হার্টস’ বলা হয়। এ শহরেরই সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় সুমনা হক সুমির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সূত্রেই পরিণয়। দু’জনে ২০০৬ সালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে এক মেয়ে ও এক ছেলে আলো ছড়িয়েছে। বড় মেয়ে হুমায়রা। আর ছোট ছেলের নাম সাহেল।

রায়নাকে ফিরিয়ে দিয়ে মাশরাফি- তাসকিনের উল্লাস। ছবিঃ ক্রিক ইনফো

রায়নাকে ফিরিয়ে দিয়ে মাশরাফি- তাসকিনের উল্লাস। ছবিঃ ক্রিক ইনফো

আক্রমণাত্মক, গতিময় বোলিং দিয়ে অনূর্ধ-১৯ দলে থাকতেই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাবেক ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের নজর কেড়েছিলেন। অ্যান্ডি রবার্টস তখন দলটির অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্বে ছিলেন। রবার্টসের পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ এ-দলে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ এ-দলের হয়ে একটি মাত্র ম্যাচ খেলেই মাশরাফি জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। ৮ নভেম্বর, ২০০১ এ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে। একই ম্যাচে খালেদ মাহমুদেরও অভিষেক হয়। বৃষ্টির বাগড়ায় ম্যাচটি অমীমাংসিত থেকে যায়। মাশরাফি অবশ্য অভিষেকেই তার জাত চিনিয়েছেন। অভিষেকে ১০৬ রানে ৪টি উইকেট নেন তিনি।

মাশরাফিগ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন তার প্রথম শিকার। মজার ব্যাপার হল, মাশরাফির প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচও ছিল এটি। তিনি এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ৩১তম খেলোয়াড় এবং ১৮৯৯ সালের পর তৃতীয়। একই বছর ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরানের সঙ্গে। অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮ ওভার ২ বলে ২৬ রান দিয়ে বাগিয়ে নেন ২টি উইকেট।

ব্যক্তিগত তৃতীয় টেস্ট খেলার সময় তিনি হাঁটুতে আঘাত পান। এর ফলে তিনি প্রায় দু’বছর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে বাধ্য হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট খেলায় তিনি সফলতা পান। ৬০ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর আবার তিনি হাঁটুতে আঘাত পান। এ যাত্রায় তিনি প্রায় বছরখানেক মাঠের বাইরে থাকতে বাধ্য হন।

২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে খেলার সময় রাহুল দ্রাবিড়কে অফ-স্ট্যাম্পের বাইরের একটি বলে আউট করে তিনি স্বরূপে ফেরার ঘোষণা দেন। সেই সিরিজে তিনি ধারাবাহিকভাবে বোলিং করেন এবং সচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলিকে আউট করার সুযোগ তৈরি করেন। তবে ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় তিনি উইকেট পাননি। এই সিরিজের একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি।

২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তিনি ভালো বল করেন। বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে তার গড় ছিল সবচেয়ে ভাল। কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাটকীয় জয়ে তিনি অবদান রাখেন। তিনি মারকুটে ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে শূন্য রানে আউট করেন এবং দশ ওভারে মাত্র ৩৩ রান দেন।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ভাল পেস বোলারের ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশে মোহাম্মদ রফিকের মত আন্তর্জাতিক মানের স্পিনার থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোন পেস বোলার ছিল না। মাশরাফি বাংলাদেশের সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন।

২০০৬ ক্রিকেট পঞ্জিকাবর্ষে মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারি। তিনি এ সময় ৪৯টি উইকেট নিয়েছেন।

২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ে মর্তুজা ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ৩৮ রানে ৪ উইকেট দখল করেন। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি খেলায় নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বিজয়েও মাশরাফির ভূমিকা রয়েছে।

মারকুটে এই ব্যাটসম্যান ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি পরপর চার বলে ছক্কা হাঁকান। সেই ওভার থেকে তিনি ২৬ রান সংগ্রহ করেন যা কোন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের জন্য এক ওভারে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।

১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ১১ বার চোটের কারণে দলের বাইরে যেতে হয়েছে মাশরাফিকে। চোটই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। চোটের কারণে অপারেশন টেবিলে তাকে যেতে হয়েছে ১০ বার। এরপরও দেশকে ভালোবেসে খেলে যাচ্ছেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম নির্ভীক এই ক্রিকেটার।

২০১১ সালের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলতে না পারলেও ২০১৫ সালে বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। গ্রুপপর্বে আফগানিস্তান ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠান বাংলাদেশকে। সেখানে ভারতের সঙ্গে বিতর্কিত হারে বিদায় নেন।

এরপর ঘরের মাঠে তার নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬ বছর পর জয় ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হোয়াইটওয়াশ করে। বিশ্বকাপে বিতর্কিতভাবে হেরে যাওয়া ভারতের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ জেতান। আর সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিরিজ জিতে নেয়। তার দ্বিতীয় মেয়াদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট পেয়েছে ভিন্নতা ও অভাবনীয় সাফল্য।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের দলপতি ও ১৬ কোটি মানুষের আস্থার প্রতিক এবং ভরসাস্থল মাশরাফি বিন মর্তুজার আজ ৩২ তম জন্মদিন। মাশরাফি শুধুমাত্র একজন অধিনায়কই নন, তিনি অনুপ্রেরণার অপর নাম, বাংলাদেশের ক্রিকেটের রূপকথার নায়ক।

Share

আরও খবর