মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়াপ্রথমেই রাশিয়ার সর্বশেষ খবর। আর সেটি হল অনেকটাই ন্যাটোর আদলে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস বা সিআইএস গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া। ১৬ই অক্টোবর রাশিয়া এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ মিলে এই যৌথবাহিনী গড়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। দ্বিতীয়ত রাশিয়া পূর্ব কোন ঘোষণা না দিয়েই সিরিয়ার এক বিশাল অঞ্চলসহ আশপাশে বিভিন্ন দেশের ওপরও নো-ফ্লাই জোন বা উড্ডয়ন-নিষিদ্ধ অঞ্চল গড়ে তুলেছে। অপরদিকে চীন আইএসআইএল বিরোধী জোটে (রাশিয়া, সিরিয়া, ইরান ও ইরাকের মধ্যে গড়ে-ওঠা) যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি এক্সপ্রেস এর মত সংবাদমাধ্যম গুলো এখন আইএসআইএল-এর চূড়ান্ত পতন এর সময় হিসেব করছে ঘন্টা ধরে। এর সাথে অধ্যাপক উইলিয়াম অ্যাংদাল এর মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুশ অভিযান শুরুর পর ওয়াশিংটনের আসল চেহারা সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

এবার আসা যাক প্রথম খবরটিতে। ১৬ই অক্টোবর কাজাখিস্তানে এক সভায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর উপস্থিতিতে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস বা সিআইএস গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার লক্ষ্য সংকটকালে নিজ নিজ সীমান্ত প্রতিরক্ষায় এ বাহিনী তৎপর থাকবে। এই সভায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বক্তব্যের অন্যতম একটি দিক হল আফগানিস্তান থেকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসীদের এই এলাকায় প্রবেশের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ। এটি এমন এক সময় হল যখন আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন প্রায় ৯,৮০০ সেনা আগামী বছরেও সেখানে থাকবে বলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মাত্র একদিন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি শোচনীয় হতে চলেছে। এ পরিস্থিতিতে সমন্বিত জবাব দেয়ার জন্য সিআইএস দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

এদিকে পূর্ব কোন ঘোষণা না দিয়েই রাশিয়া সিরিয়ার এক বিশাল অঞ্চলসহ আশপাশে ভিন্ন দেশের ওপরও নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করেছে। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ব্যাখ্যামূলক সংবাদের ওয়েব সাইট ‘দেবকা ফাইল’ সূত্রে জানাযায়, রাশিয়ার এই নো-ফ্লাই জোনের মধ্যে সিরিয়ার ও আংশিকভাবে ইসরাইলের দখলে-থাকা গোলান পার্বত্য ভূমি, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও সাইপ্রাস রয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে রাশিয়া। ফলে আইএসআইএল বা দায়েশসহ সিরিয়ার আসাদ সরকার-বিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর শত শত জঙ্গি নিহত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া এ অঞ্চল নো-ফ্লাই জোন অঞ্চল গড়ে তোলায় জঙ্গিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পরল বলে ধরনা করছে বিশ্লেষকরা।

শুধু তাই নয় রাশিয়া সিরিয়ার লজাকিয়া বন্দরে ‘মস্কোকাভা’ নামের একটি ডেস্ট্রয়ারে ৬৪টি বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ‘এস-৩০০’ নামের অত্যাধুনিক সিস্টেম মোতায়েন করেছে। যার ফলে সিরিয়ার আকাশে বিমান হামলা চালাতে হলে তুরস্ক, ব্রিটেন, ইসরাইল ও জর্দানকে রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে তাদের জঙ্গি বিমানগুলো যে কোনো সময় ভূপাতিত হতে পারে।

জানায়ায় কেবল মাত্র স্টিলথ জঙ্গি বিমান অত্যাধুনিক ‘এস-৩০০’ রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত এই রুশ সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। তবে তুরস্কে মোতায়েন মার্কিন জঙ্গি বিমানগুলো হল এফ-১৬ মডেলের। আর তুরস্ক, জর্দান, ব্রিটেন ও ইসরাইলের কাছে এই রাডার এড়ানোর মত স্টিলথ বা উন্নত জঙ্গি বিমান নেই। যার ফলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত বাহিনীকে রাশিয়ার সাথে অনেকটা বাধ্য হয়েই সমন্বয় করতে হবে। আর এই খবরটা ইসরাইলের জন্য অনেকটা আতঙ্কই বলা চলে। আর তা প্রকাশ করতে একটুও দ্বিধা করছেনা পশ্চিমা বিশ্ব।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রুশ হামলার কারণে আইএসআইএল শক্তিশালী হবে। এবং তার সাথে সুর মিলিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। এ দুই প্রেসিডেন্ট এখনও দাবি করছেন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। যার ফলে সিরিয়ায় সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হবে। আর এর জবাবে রাশিয়া সরাসরি জানিয়ে দেয়, ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়ার নাগরিক নন। তাদের চাওয়ায় কিছু যায় আসে না। সিরিয়ার জনগণই দেশটির ভবিষ্যত ও প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়া কিংবা আসাদের ভাগ্য নির্ধারণের কেউ নন।

যদিও রাশিয়ার এই কড়া জবাবের ফলে মার্কিন জোটকে চুপই থাকতে হয়েছে। কারন গত ১ বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশ আন্তর্জাতিক জোট করে আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চলাচ্ছে। এর সাথে তারা বারবার বলেছে আইএসআইএল-কে পরাজিত করতে অনেক সময় লাগবে। তার সাথে জোট সম্প্রসারনেরও আহ্বান জানায় তারা। এছাড়া সিরিয়া সরকার কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই বিমান হামলা চালায় তারা। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগায় রাশিয়া। তারা জোটে যোগ দিতে রাজি হয় আর সাথে প্রশ্ন রাখে, তোমরাও আইএসআইএল-এর ওপর হামলা চালাচ্ছ, আমরাও আইএসআইএল-এর ওপর হামলা চালাব, বাধা কোথায়? অপরদিকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদও রাশিয়ার কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন। ফলে রাশিয়ার জন্য সব পথই খুলে যায়। বৈধভাবেই লড়াইয়ে নামে রাশিয়া।

আর লড়াইয়ে নেমে সিরিয়ায় আমেরিকার আসল চেহারা ফাঁস করে দেয় রাশিয়া। গত ১ বছরে আন্তর্জাতিক জোট যা করতে পারে নি তা ১ মাসেরও কম সময়ে প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছে রাশিয়া। সারা পৃথিবীতে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে বিমান হামলায় তাদের সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দেয় রুশ যুদ্ধবিমান। এছাড়া, একটি সুইসাইড বেল্ট ফ্যাক্টরি, বোমা ও মাইন তৈরির কারখানাসহ আইএসআই এল-এর বহু স্থাপনা ধ্বংস করে। রাশিয়ার পক্ষে ৫০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার অংশ নিচ্ছে এ অভিযানে। শত বারের বেশি বিমান হামলা হয়েছে আইএসআই-এর আস্তানায়। রুশ বিমান হামলায় দিশেহারা হয়ে আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা সিরিয়া থেকে পালাতে শুরু করে। শত শত সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণও করে। আর এসব ঘটে হামলা শুরুর প্রথম ৫ দিনেই। এর ফলে সভাবতই প্রশ্ন উঠে, তাহলে কী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আইএসআইএল-কে হামলার নামে আড়াল করে রেখে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে সাহায্য করে আসছিল?

চলবে…..

মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া, এক পরাশক্তির পতনের ঘন্টা (পর্ব -২)

Share

আরও খবর