১০ ফেব্রুয়ারি, লাইফ স্টাইল ডেস্কঃ বাংলার ভেনিস বরিশাল। পরিবারসহ বা ব্যক্তিগত ভাবে ঘুরতে যাওয়ার জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান! এখানে আছে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। যেমন -প্রকৃতির কবি জীবননান্দ দাশের বাড়ী, কবি কামিনী রায়ের বাড়ী, উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু ব্যাপটিস্ট মিশন, মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রতিষ্ঠিত বি এম স্কুল, বি এম কলেজ, রবিন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে” এর স্মৃতি বিজড়িত তমাল গাছ, বরিশাল কলেজ টাউনহল, দুর্গা সাগর দিঘী, মুকুন্দ দাসের কালিবাড়ী, বরিশাল মহাশ্মশান, বিবির পুকুর, গুঠিয়া মসজিদ, মাহিলাড়া মঠ, চাখার শেরে বাংলা যাদুঘর, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, গজনী দীঘি, মনসা মঙ্গল কাব্যের রচয়িতা বিজয় দাশ গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়ীসহ অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দিটাইমসইনফো ধারাবাহিকভাবে বাংলার ভেনিস বরিশালের বিভিন্ন পর্যটনের স্থানগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরবে।আমাদের এবারের আয়োজন বরিশাল মহাশ্মশান ও বিবির পুকুর নিয়ে।

বরিশাল মহাশ্মশান
বরিশাল মহাশ্মশান ১০০০ বছর ব্যাপী নানা ঘটনার ও স্মৃতির স্বাক্ষী হয়ে আছে।  সংগ্রামী বহু মানুষের শেষ আশ্রয় এই মহাশ্মশান। বহু সমাধির উত্তর প্রজন্ম আজ আর নেই। সে সব সমাধিতে হয়তো কোন দিন কেউ ফুল দেবে না। তবুও শ্মশান দিপালী উৎসবে হয়ত দীপ জ্বেলে দেবে কেউ।বরিশাল মহাশ্মশান

ইতিহাস
ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ধারনা করা হয় বরিশাল মহাশ্মশানের বয়স ১০০০ বছরের! এখানে সবচেয়ে প্রাচীন সমাধি ফলকটি ১৩২৫ সালের! এর আগে বহু প্রাচীণ সমাধি ধ্বংস হয়েছে এবং বহু সমাধি সাল তারিখ বিহীন পরে থাকায় এর ইতিহাস পাওয়া যায়নি।  শ্মশানের সাথে নদী-খাল কিংবা স্রোতধারার যোগসূত্র রয়েছে। শ্মশানের ভষ্ম এই স্রোতধারাই বহন করে, পদ্মা কিংবা গঙ্গায় নিক্ষেপ করে পূণ্যফল নিয়ে আসে (সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যুগ যুগ ধরে এই বিশ্বাসের ফলেই মানব ভস্ম নদীতে নিক্ষেপের প্রচলন)। বর্তমানে বরিশাল মহাশ্মশানের নাম করণ করা হয়েছে বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষের নাম অনুসারে।

সমাধি সংখ্যাঃ
বরিশাল মহাশ্মশানে পাকা সমাধি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার। এর মধ্যে ৫০০এর বেশী সমাধি রয়েছে যাদের কোন স্বজন নেই। এ ধরনের শ্মশানকে হলুদ রং দিয়ে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাধি সৌধঃ
বরিশাল মহাশ্মশান শুধু বরিশাল জেলা নয়, ফরিদপুর, মাদারিপুর, পটুয়াখালী সহ অপরাপর জেলার বহু মানুষের শেষকৃত্য এখানেই সম্পন্ন হত। সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে এই শ্মশানই ছিল একমাত্র স্বীকৃত ও অভিজাত শ্মশান ঘাট। বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের বহু মানুষের শেষকৃত্য হলেও স্বজনহীন থাকায় তাদের অনেকের সমাধি চিহ্নিত করণ সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্ম সমাধির মধ্যে কবি জীবনানন্দ দাশের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ ও পিতা সত্যেন্দ্র দাশের সমাধি থাকা খুবই স্বাভাবিক। বরিশালে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের মধ্যে তৎকালীন সময়ে মহাত্মা অশ্বিনী দত্তের সমাধি হয়েছিল কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশান ঘাটে, ডাঃ তারিণী গুপ্তের সমাধি বাড়িতেই হয়েছিল।

অন্যান্য যাদের সমাধি সৌঁধের খোঁজ পাওয়া গেছে তার মধ্যে রাজনীতিবিদ শরৎচন্দ্র গুহ, কংগ্রেস সভাপতি প্রাণ কুমার সেন, বিপ্লবী দেবেন্দ্র নাথ ঘোষ, মনোরমা বসু মাসীমা, তার স্বামী বাকালের জমিদার চিন্তা হরণ বসু, কংগ্রেস সম্পাদক শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, বিপ্লবী হিরণ লাল ভট্টাচার্য, ভাষা সৈনিক রাণী ভট্টাচার্য, সদর গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক শানি লতা গুহ, সংগ্রামী রাজনীতিবিদ সুধীর সেন, জঙ্গীদের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত জজ জগন্নাথ পাঁড়ে, শিক্ষক অম্বিকা চরণ সরখেল, শিক্ষক মনীন্দ্র নাথ সমাজদার, সংগীত গুরুবরিশাল মহাশ্মশান পঞ্চানন ঘোষ, চারুশিল্পী বলহরি সাহা, বি.এম কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক আর.পি সেন, শিক্ষক শুধাংশু বটব্যাল, ভাষা সৈনিক বরুণ প্রসাদ বর্মন, শ্যামপুরের জমিদার কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী(নাটু বাবু), সংগীত শিক্ষক নারায়ণ সাহা, ড. প্রণতি বোস, শিক্ষক ব্রজেন্দ্র নাথ বড়াল, ব্যয়ামগুরু বলাই শীল, কবি রবীন সমদ্দার, প্রকাশক মাখম লাল চক্রবর্তী, শিক্ষক নরেন্দ্র নাথ দাস, শিক্ষক প্রাণ কৃষ্ণ সেন গুপ্ত, সাংবাদিক আইনজীবী মিহির লাল দত্ত, ডাঃ রনজিৎ বড়াল, হিমাংশু কুমার দাশগুপ্ত নাথু, ডাঃ দেবাশীষ সমদ্দার, ডা: বরুণ কুমার বসু, যাদের সমাধি স্মারক রয়েছে তাদের মধ্যে প্রয়াত সমাজসেবী অমৃতলাল দে, ডাঃ এস.সি রায়, ড. স্বদেশ বসু উলেস্নখ যোগ্য।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্মশান দিপালী উৎসব:
প্রতিবছর ভূতচতুর্দশীর পূণ্য তিথিতে প্রিয়জনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাদের সমাধিতে দীপ জ্বালিয়ে দেওয়ার এই প্রথা কবে থেকে চালু হয়েছে তা জানা না গেলেও প্রয়াত শতবর্ষের বিপ্লবী দেবেন্দ্র নাথ ঘোষ এই উৎসব ছোটবেলায়ও দেখেছিলেন বলে জীবদ্দশায় উল্লেখ করেছিলেন।বরিশাল মহাশ্মশান দিপালী-উৎসব সে কারণেই কাউনিয়া মহাশ্মশানের এই দিপালী উৎসবের প্রথা শতবছর ধরে চলছে বলা যায়। আদিশ্মশান প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে এর প্রত্যক্ষ কোন বিবরণী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। দিপালী উৎসবে প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে সমাধিতে শুধু মাত্র দীপ জ্বালানোই হয়না, প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে খাবার-দাবার ও দেয়া হয়ে থাকে। সেই সাথে ধূপ, ধুপকাঠি জ্বেলে দেয়া হয়। কেউ কেউ ধর্মীয় গান ও খোল বাদ্য সহকারে কীর্তণ করেন প্রিয়জনের আত্মার সন্তুষ্টির জন্য। প্রিয়জনদের এই শ্মশান দিপালী উৎসব বরিশাল বিভাগ তথা ও বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে শ্মশান দিপালীর এ উৎসব ভারতবর্ষ এমনকি পৃথিবীর কোথাও এত বড় আকারে পালিত হয়না! এই উৎসব বরিশাল বাসীর নিজস্ব চিন্তা ও সংস্কৃতির ফসল। প্রতিবছর শশ্মান দিপালী উৎসবে, সমাধি সৌধে দীপ জ্বেলে দেবে দেবার পর আলোর রশ্নিতে ভরে ওঠে মহাশ্মশান। এই উৎসব দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক এসময় বরিশালে আসেন। তাদের কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দীপ জ্বেলে দেয়। শ্মশান দিপালীর এই উৎসব একক ও অনন্য। এই দিপালী উৎসব বরিশালের শতবছরের ঐতিহ্যের স্মারক।

বিবির পুকুর
বরিশাল শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে রেখেছে এর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শত বছরের অধিক সময়ের ঐতিহ্যবাহী বিবির পুকুরটি। এটি ইতিহাসের নীরব সাক্ষীও। শহরের সদর রোডের পুব পাশে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮৫০ ফুট প্রস্থ বিবির পুকুরটি  বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রের একমাত্র পুকুর।

সূত্রমতে, ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ভাগে খ্রিস্টান মিশনারিরা বরিশালে আগমন করেন। তারা নগরে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেন। সূত্রে আরও জানা গেছে, উইলিয়াম কেরি পর্তুগিজ দস্যুদের থেকে জিন্নাত বিবি নামে এক মুসলিম মেয়েকে উদ্ধার করে তাকে লালন-পালন করেন। পরে এক মুসলিম যুবকের কাছে জিন্নাত বিবিকে বিয়ে দেয়া হয়। উইলিয়াম কেরি জিন্নাত বিবিকে জেনেট বলে ডাকতেন। জিন্নাত বিবি অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী হাশেম আলী খানের বাড়ির ভূমির ওপরস্থ মালিক ছিলেন এবং সেখানে জিন্নাত বিবির বাসভবন ছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জিন্নাত বিবি জনগণের জলকষ্ট নিবারণের জন্য শহরের সদর রোডের পুব পাশে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮৫০ ফুট প্রস্থ একটি পুকুর খনন করেন। সে পুকুরটিই বিবির পুকুর নামে পরিচিত।বিবির পুকুর

জানা গেছে, কীর্তনখোলা নদীর সাথে এ পুকুরের দুটি সংযোগ ছিল। এর একটি সার্কিট হাউজ হয়ে মৃতপ্রায় ভাটার খাল হযে কীর্তনখোলায় এবং অপরটি বিলীন হযে যাওয়া গীর্জা মহল্লার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদীর সাথে সংযোগ ছিল। যে কারণে বিবির পুকুরে জোয়ার-ভাটা অব্যাহত থাকতো। এছাড়া জোয়ারেও নদীর মাছ এ পুকুরে চলে আসতো। কালের আবর্তে সংযোগ খাল দুইটি হারিয়ে যাওয়ায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিবির পুকুর।

চলবে..

Share

আরও খবর