৫ জানুয়ারি, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) আদায়ে অধিক স্বচ্ছতা ও ফাঁকি রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) যোগ হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামের নতুন সিস্টেম।

নতুন এই সিস্টেমে সরাসরি মনিটরিং করা যাবে সারা দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ। সঙ্গে নিশ্চিত হবে ঠিকঠাক ভ্যাট আদায়। এজন্য অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে চলমান ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) মেশিন।

বর্তমানে বুলগেরিয়া, জর্জিয়া ও চীনের ২৪টি প্রদেশসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহারে এসেছে সফলতা। এনবিআর ওই উদাহরণকে সামনে নিয়ে ফিনান্সিয়াল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে বাস্তবায়ন করতে চায়। এনবিআর মনে করছে, নতুন এ সিস্টেম বাস্তবায়ন করতে পারলে একদিকে যেমন ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে ভ্যাট আদায় বৃদ্ধি পাবে অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। যদিও এ ধরনের ডিভাইস চালু প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, ফিনান্সিয়াল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর বিষয়টি প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। এজন্য সবার আগে বর্তমান বাজারে বিদ্যমান সব ইসিআর পরিবর্তন করতে হবে। কারণ বর্তমান ইসিআরে ওই ডিভাইস সংযুক্ত করা সম্ভব নয়। এজন্য ২০০৮ সালের ইসিআর-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটা সংশোধন করতে হবে। মেশিনের ওই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেটা অনুমোদন হয়ে গেলে গণবিজ্ঞপ্তি চলে আসবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে যে ইসিআর মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে, তা সহসাই পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু ইসিআর নয়, নতুন ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় যেকোনো আধুনিক হিসাবব্যবস্থা গ্রহণ করবে এনবিআর। কারণ কোনো হিসাব মেশিনের কার্য্কারিতা আছে কিনা তা সহজেই ওই ডিভাইসের মাধ্যমে বুঝতে পারবে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ।

এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন ইসিআর পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি সংশোধন হওয়ার পর ক্রয় করা হবে ফিনান্সিয়াল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। যার জন্য এনবিআরকে ব্যয় করতে হবে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা। এ সিস্টেম চালু হলে ক্রেতা বা বিক্রেতার লেনদেনের তথ্য সরাসরি এনবিআরের কাছে আসবে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সব তথ্য এক জায়গায় বসে পর্যবেক্ষণ করা। বর্তমানে বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, চীনের ২৪টি প্রদেশসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার হচ্ছে। নতুন ডিভাইসের সঙ্গে এনবিআর সিম সংযুক্ত করতে চাচ্ছে। যাতে পণ্য বা সেবা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা, বিক্রেতা কিংবা রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান এ সংক্রান্ত তথ্য পেতে পারে।

ভ্যাট আদায়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর ব্যবহার বাধ্যমূলক করলেও অভিযোগ রয়েছে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং বা অটোমেশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ভ্যাট ফাঁকি রোধের যে উদ্দেশ্য তা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বসেছে। ভোক্তার কাছ থেকে আদায়কৃত ভ্যাট ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছে না, এমন পর্যবেক্ষণ থেকেই ২০০৮ সালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর বাধ্যতামূলক করে একটি সাধারণ আদেশ জারি করে এনবিআর।

আদেশ অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১১টি ব্যবসা ও সেবার ওপর ইসিআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আসবাবপত্র বিপণন কেন্দ্র, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, ডিএমপি এলাকার অভিজাত শপিং সেন্টারের সব দোকান/প্রতিষ্ঠান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর, অন্যান্য বড় ও মাঝারি ব্যবসা (পাইকারি ও খুচরা) প্রতিষ্ঠান, স্বর্ণকার, রৌপ্যকার ও স্বর্ণ পাকাকারী প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ডিএমপি এলাকার বাইরে ও সারাদেশে উপরোক্ত তালিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর বাধ্যতামূলক করা হয়।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি তথ্যানুসারে, সারাদেশে মোট দোকানের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ এবং তার ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৭ লাখ ৫০ হাজার দোকান ইসিআর ব্যবহারের উপযোগী। এ হিসাবে ৯৯ শতাংশ দোকানেই এখনো ইসিআর নেই।

এনবিআরের হিসেবেই সারাদেশে ইসিআর ব্যবহারযোগ্য প্রতিষ্ঠান কমপক্ষে ১ লাখ। বিপরীতে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৮ হাজার। তবে ভ্যাট ব্যবস্থা অনলাইন করতে ৫০ হাজার ইসিআর ন্যায্যমূল্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। ব্যবসায়ীদের বিরোধিতায় দুই বছরের জন্য ভ্যাট আইন-২০১২ বাস্তবায়ন স্থগিত করায় এই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসে এনবিআর।

এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (কাস্টমস্ ও ভ্যাট প্রশাসন) মো. রেজাউল হাসান বলেন, ইসিআর বাধ্যতামূলক করা হলেও এতদিনে ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনয়নে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং বা অটোমেশনের বিকল্প নেই। আর অটোমেশনের অংশ হিসেবেই আমরা ডিভাইস বেইসড নতুন ইসিআর মেশিনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। যা এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেটা অনুমোদন হলেই গণবিজ্ঞপ্তি চলে আসবে। ২০০৮ সালের ইসিআর সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিটা সংশোধন হবে।

Share

আরও খবর