৯ মার্চ, অনলাইন ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী এপ্রিলের প্রথমার্ধে ভারত সফর করে ফেরার পর একই মাসের শেষ নাগাদ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পর্যালোচনা করতে বৈঠকে বসবেন বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্র সচিব। জুনের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের ছয় প্রভাবশালী মন্ত্রী একসঙ্গে যাবেন চীন সফরে। বাংলাদেশের এত মন্ত্রীর একসঙ্গে চীন সফর এটাই প্রথম।

নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, এশিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে এভাবেই সমান্তরালভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষার নীতি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা। মোদি সরকারের সময় শেখ হাসিনার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তাসহ কমপক্ষে দুই ডজন চুক্তি স্বাক্ষরের কথা চলছে। আর চীনের সঙ্গে পর্যালোচনা হবে চাইনিজ প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরে নেওয়া সিদ্ধান্ত, সমঝোতা ও চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা।

কূটনৈতিক সূত্রের খবর, তিন দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ এপ্রিল নয়াদিল্লি যাবেন। তিনি ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারত সফর করবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার এই সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে চলতি মার্চের শেষ নাগাদ। এবারের সফরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে এক বিরল সম্মান দিতে যাচ্ছে ভারত। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি প্রধানমন্ত্রীকে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি ভবনে রাখা হবে। শুধু এই সম্মানই নয়, শেখ হাসিনার ভারত সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি নতুন সোপান অর্জনের প্রস্তুতি চলছে। দুই দেশের মধ্যে সামরিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৪০টি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। উভয় পক্ষের শেষ মুহূর্তের সম্মতিতে কমপক্ষে দুই ডজন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। বরাবরের মতো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিকে বাংলাদেশ তার প্রধান এজেন্ডা রাখলে এবারও এ চুক্তি না হওয়ার শঙ্কা আছে। তবে অভিন্ন নদীগুলোর সমন্বিত একটি প্রজেক্টের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গঙ্গা ব্যারাজের বিষয়ে আগ্রহী। তাই এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে। তবে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের বাইরে ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা খাতে একটি চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখনই এ বিষয়ে চুক্তি না করে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছে। এবার ভারতের পক্ষ থেকে নতুন করে তিন বিলিয়ন ডলার ঋণেরও একটি প্রস্তাব আছে। আগে এ ধরনের সহজ শর্তে ঋণ শুধুই অবকাঠামো খাতে ব্যবহার হলেও এবার এই ঋণের আওতায় সামরিক সরঞ্জাম ও সমরাস্ত্র কেনার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাব আছে। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসলে দুই শীর্ষ নেতাই শেষ মুহূর্তে নেবেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সামরিক চুক্তিতে সাধারণ প্রশিক্ষণ বিনিময় ও যৌথ অনুশীলনের বিষয়গুলোই থাকবে। এক দেশে আরেক দেশের সেনা পাঠানোর মতো কোনো ইস্যু সামরিক চুক্তিতে থাকছে না।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর, চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম কেনার খবরে ভারতীয় প্রশাসনে এক ধরনের উদ্বেগ আছে। এ কারণে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো ইস্যুর বাইরে বাংলাদেশের সামরিক খাতে চীনের বলয় নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন থাকায় সামরিক চুক্তির বিষয়ে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে খানিকটা তোড়জোড় আছে বলে ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যমে মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে আগের মতোই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা কম থাকলেও ভারত তার অঙ্গীকারের কথা বলে আসছে। সর্বশেষ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর গত মাসে ঢাকা সফরে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দিল্লির ওপর আস্থা রাখার বার্তা দিয়ে গেছেন। ঢাকার পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার যুক্তিও আছে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারাই। কারণ এর আগে বেশ সময় নিয়ে হলেও ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির মতো আরও জটিল ইস্যুর সহজ বাস্তবায়ন করেছে এবং তা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হয়েছে।

জানা যায়, ঠিক একই সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় অগ্রসরমান সম্পর্ক আরও গতিশীল করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখছে ঢাকা-বেইজিং। মূলত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের পরে আসা গতি ধরে রাখতে দুই দেশের মধ্যে চলছে নানা ধরনের কূটনৈতিক তত্পরতা। এরই অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের পর এপ্রিলের শেষ নাগাদ ঢাকা-বেইজিং পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে আলোচনা। প্রায় একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সুমদ্র অর্থনীতি নিয়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্ধারণের জন্য প্রথম বৈঠক আয়োজনের আলোচনা হচ্ছে। আর ইতিমধ্যেই আগামী জুনে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্মেলন ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এ অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রভাবশালী ছয় মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। সে হিসেবে চীন সফর করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চীন তার ব্যবসা-বাণিজ্য কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ঢাকা ও বেইজিং যৌথভাবে এ উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা করবে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কমিটি কাজ করছে। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে এপ্রিলে এ বৈঠক আয়োজনের আলোচনা করছে বাংলাদেশ ও চীন।

Share

আরও খবর