সুফিয়া কামাল২০ জুন, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/ কোন্ পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে?/ আনল ডেকে মটরশুঁটি,/ খেসারি আর কলাই ফুলে/ আনল ডেকে কুয়াশাকে/ সাঁঝ সকালে নদীর কূলে। -ছন্দে ছন্দে হেমন্তের এই মনকাড়া বর্ণনাটি কবি সুফিয়া কামালের।

কবি বেগম সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ। সুফিয়া কামালের জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক অভিজাত পরিবারে। কবি,বুদ্ধিজীবী,সমাজনেত্রী,নারী ব্যক্তিত্ব এবং নারী জাগরণের পথিকৃৎ অনেক বিশেষণেই ভূষিত তিনি। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন সমাজসেবী ও নারী নেত্রী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

তিনি স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত । ১৯২৩ সালে সুফিয়া কামাল রচনা করেন তার প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ যা বরিশালের তরুণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ । কলকাতায় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন প্রকাশিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক `বেগম` পত্রিকার প্রথম সম্পাদক তিনি।

১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন।এ সময় সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি, দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত ছিলেন। ছায়ানট, কচিকাঁচার মেলা ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), একাত্তরের ডায়েরী, মোর যাদুদের সমাধি পরে, একালে আমাদের কাল, মায়া কাজল (১৯৫১),কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) ইত্যাদি।২০০২ সালে বাংলা একডেমী সুফিয়া কামালের রচনাসমগ্র প্রকাশ করে।

সাহিত্যচর্চার জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার `তঘমা-ই-ইমতিয়াজ` লাভ করেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), উইমেনস ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস ক্রেস্ট (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) লাভ করেন।

বস্তুতপক্ষে সামাজিক ও সংস্কৃতিবান মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন এক বিশাল শক্তির প্রতীক।এই সমাজ সম্পৃক্ততায় তিনি নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন আরো বড় মাপের মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবি বেগম সুফিয়া কামালের জন্মদিন উপলক্ষে স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। এ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সুফিয়া কামাল ছিলেন একদিকে আবহমান বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি, মমতাময়ী মা; অন্যদিকে বাংলার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলো তাঁর আপোষহীন এবং দৃপ্ত পদচারণা। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা কবি সুফিয়া কামালের জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সুফিয়া কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে আন্দোলন করেন। সাহিত্যে সুফিয়া কামালের সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখনি আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।’

Share

আরও খবর