আমাদের শরীরের যেকোন স্থানে ক্যান্সার হতে পারে। সারা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ ক্যান্সার। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পরেনা ফলে শেষ পর্যায়ে ভাল কোন চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়না। বলা হয়ে থাকে, প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে প্রায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
মানুষের শরীর অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষের মাধ্যমে তৈরি। এই কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর মারা যায় এবং এই পুরোনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ জন্মে। সাধারণভাবে কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং নিয়ম মত বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয়। সাধারনভাবে বলতে গেলে যখন এই কোষগুলো কোন কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে তখন টিউমার সৃষ্টি হয়। টিউমার বেনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। এই টিউমার কোষগুলো যখন আশেপাশের কোষকে ভেদ করতে পারেনা তখন তাকে নিরীহ বা বেনাইন টিউমার বলে আর যদি ভেদ করতে পারে তাকে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বলে। অনেক ক্যান্সার বেনাইন টিউমার হিসেবে প্রথমে শুরু হয় পরে মধ্যেকার কিছু কোষ পরিবর্তিত হয়ে ম্যালিগন্যান্ট হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থারজরিপ মতে ২০১২ সালে প্রায় ৮২ লক্ষ মানুষ সারা বিশ্বে ক্যান্সার জনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। সারাবিশ্বে ক্যান্সারের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখি। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বর্তমান গতিতে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ৫০-৬০ শতাংশ লোক তাদের জীবদ্দশার কোন না কোন সময়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশ এখন অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে এদেশে মৃত্যুর ষষ্ঠতম প্রধান কারণ ক্যান্সার।

ক্যান্সারের কারণ সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারনা করা হয়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত কমতে থাকে, ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততই বাড়তে থাকে। এছাড়া গবেষকরা খাবার এবং জীবনযাপনের ধারা যেমন ধুমপান ও মদপানের সাথে ফুসফুস, মুখ ও কন্ঠনালীর এবং লিভারের ক্যান্সারের যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছেন। তেমনিভাবে পান-সুপারি, জর্দা, মাংস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ইত্যাদি খাবারের সাথেও ক্যান্সারের যোগসুত্র খুঁজে পেয়েছেন। যারা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম কম করেন তাদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি। আর পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে জিনগত সম্পর্কের কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। পরিবেশ, পেশাগত কারণ এবং সর্বোপরি রাসায়নিক পদার্থের সাথে ক্যান্সারের অনেক বড় সম্পর্ক রয়েছে।

একেক জায়গায় ক্যান্সারের একেক ধরণের উপসর্গ দেখা দিলেও সাধারণ কিছু লক্ষণ সব ক্যান্সারেই হয়। যেমন- খুব ক্লান্ত বোধ করা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, মলত্যাগে পরিবর্তন আসা, শরীরের কোন জায়গায় চাকা বা দলা দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, গলার স্বরে পরিবর্তন, জ্বর, রাতে ঠান্ডা লাগা বা ঘেমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদিও ক্যান্সারের লক্ষণ। অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে।

রোগের ইতিহাস শুনে, শারীরিক পরীক্ষা করে বেশ কিছু রক্ত, ইমেজিং এবং হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করে ক্যান্সার সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশেই এখন ক্যান্সারের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় যেমন ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্রোপাচার ছাড়াও কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। ইদানিং আধুনিক পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে অর্থাৎ বায়োলজিক্যাল সেফটি কেবিনেট এ কেমোথেরাপি মিশ্রণ করার পর ইনফিউশন সেটের মাধ্যমে রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও সিটি সিমুলেটর দ্বারা টিউমারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করে নিখুঁত 3D বা ত্রিমাত্রিক প্লান তৈরি করে লিনিয়ার এক্সিলেটরের মাধ্যমে রেডিওথেরাপি প্রদান করা হয়। কিছু ক্যান্সার চিকিৎসায় উচ্চ বিকিরণ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্রাকিথেরাপি ব্যবহার করা হয়।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরেন এবং এজন্য ক্যান্সারের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসার দিকে এখন জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এধরনের ঔষধ তৈরির ব্যাপারে এখন গবেষণা চলছে সাথে চলছে ক্যান্সারের ভ্যাক্সিন তৈরির চেষ্টাও।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, নিয়মিত কিছু ব্যাপার মেনে চললে ক্যান্সারের কিছু ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। প্রতিদিন কিছু ব্যায়াম করে, স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে, তেল চর্বি জাতীয় খাবার কম খেয়ে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল এবং আশযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করে, শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে এরোগের ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। সেই সাথে ধুমপান ও মদপান, পান সুপারি, জর্দা, তামাক-পাতা খাওয়া বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে শরীরে কোন অস্বাভাবিক দেখা দিলে দেরী না করে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে আর বয়স যদি হয় পঞ্চাশের বেশি তবে নিয়মিত ডাক্তারের কাছে গিয়ে শরীর পরীক্ষা করানো উচিত।
সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং সবাই মিলে এক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হবে।

ডঃ এ কে এম আবু মোত্তালেব
এসোসিয়েট কনন্সাল্ট্যান্ট, নেফ্রোলজি

তারিখ- ০৪/০২/২০১৭

Share

আরও খবর