২ আগস্ট, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত আরো এক হাজার ৩১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু এ সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই নানা মহল থেকে দুর্নীতি ও ভোগান্তির অভিযোগ উঠে আসছে। এসব অভিযোগ তদন্তে ৪০ সদস্যের ২০টি টিম গঠন করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ এমপিও’র সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কার্যক্রম শুরু করতেও সময় নষ্ট হয়েছে। শুরুতে এমপিও প্রক্রিয়া মাঠপর্যায়ে হবে নাকি অনলাইন প্রক্রিয়ায় হবে এ নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। শেষে ভোগান্তি এবং অনিয়ম এড়াতে অনলাইনেই এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এমপিওভুক্তির এই প্রক্রিয়া অনলাইনে দেওয়ার পরও ভোগান্তি ও দুর্নীতি দুটোই বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনলাইনে এমপিও প্রক্রিয়ায় মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘নানা অবস্থার শিকার হয়ে ঘুষ দিতে হয়। কাজটা যাতে তাড়াতাড়ি হয় এজন্য শিক্ষকরা ঘুষ দিয়ে থাকেন। যদি বেতন ২২ হাজার টাকা হয়, আর এমপিওভুক্ত হতে এক বছর বিলম্ব হয় তবে শিক্ষক বঞ্চিত হবেন দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা থেকে। এ কারণে এমপিওভুক্তির জন্য ৬০ হাজার বা এক লাখ টাকা খরচ করলে তো তেমন কোনো ক্ষতি নেই।’

কারো মতে, একজন স্কুল শিক্ষকের এমপিও’র ফাইল যদি ছয় মাস আটকে থাকে তা হলে সে প্রায় ৯৬ হাজার টাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। এ ছাড়া অনেক শিক্ষক এমপিওভুক্ত হওয়ার যোগ্য না হলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনৈতিকভাবে সুবিধা দিয়ে এমপিও বাগিয়ে নিচ্ছেন।

সূত্র মতে, ২০১৫ সালে শিক্ষকদের এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বা বেতন-ভাতার সরকারি অংশ) বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের হাতে থাকা এই এমপিও ৯টি আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি রোধ করা। কিন্তু সে লক্ষ্যতো পূরণ হয়নি বরং শিক্ষকদের হয়রানি কয়েকগুণ বেড়েছে।

এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যারা এসব অনিয়মে জড়িত তারা মাঠ পর্যায় হোক বা শিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এভাবে অনিয়ম দুর্নীতি চলতে পারে না।’

মাঠ পর্যায়ে কারা এসব করছে তাদের সনাক্ত করতে ২০টি টিম গঠনের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। এ নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি। মন্ত্রীর নির্দেশনার পরপরই অনিয়ম ধরতে ৪০ সদস্যের তদন্ত দল গঠন করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এই ৪০ জন ২০টি টিমে কাজ করবেন। ২০টি টিমের প্রত্যেকটিতে দুইজন করে কর্মকর্তা রাখা হয়েছে। এক এক টিম কয়েকটি জেলার দায়িত্ব পালন করবেন। এই টিমের অধিকাংশই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত সরকারি কলেজের শিক্ষক। তারা সবাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। মাঠ পর্যায়ের এমপিওর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরাই। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারগণ।

জানা যায়, গত মাসে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে ২০টি টিম গঠন করা হলেও কয়েকজনের বিরোধীতার কারণে সেটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়নি। পরে গত ১৭ জুলাই মাউশিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অধিকাংশ পরিচালক এমপিওভুক্তিতে জালিয়াতি ও দুর্নীতির কথা স্বীকার করে প্রতিকারের ব্যবস্থা চান।

আলোচনার এক পর্যায়ে মহাপরিচালক নির্দেশ দেন ৪০ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত ২০টি টিম দেশের ৬৪টি জেলা সরজমিন পরিদর্শন করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক চিত্র অভিযোগভিত্তিক সুস্পষ্ট মতামতসহ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে। টিম বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমপিওভুক্তিতে দুর্নীতির প্রতিবেদনগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালাবে। টিমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমপিও অঞ্চলভিত্তিক থাকবে নাকি পুনরায় কেন্দ্রীয়ভাবে হবে তা নির্ধারণ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হবে।

মাউশি সূত্রে জানা যায়, শিক্ষকদের এমপিও হয়রানি বন্ধ করতে সারা দেশে ৯টি আঞ্চলিক অফিসকে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়ার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনের আওতায় আনা হয়। দুই বছরের মাথায় মাউশির প্রায় সব কর্মকর্তা নানা হয়রানির কথা বলছেন।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এমপিওভুক্তি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আসছে আমাদের কাছে। এ নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এমপিও অনলাইন ও বিকেন্দ্রীকরণ করার পর আসল চিত্র কী তা আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার। এজন্য এমপিও নিয়ে কাজ করছেন এরকম কর্মকর্তাদের এই টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাদের প্রতিবেদন পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থার কথা ভাবা হবে।’

Share

আরও খবর