%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%b2-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a7%8e%e0%a6%b8%e0%a6%beযার হাতে ও পায়ে শিকড়ের মত মাংসপিণ্ড। ছিল না হাতের আঙুলের অস্বিত্ব । নিজের হাত হাত-পা দেখে তিনি ভয় পেতেন। ২০০৫ সালে এই রোগের সূত্রপাত হওয়ার পর ভারতেও চিকিৎসক দেখাতে গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে চিকিৎসকরা মাদ্রাজ নেওয়ার পরামর্শ দিলে টাকার অভাবে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। সুস্থ্য হওয়ার আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন। হাতে ও পায়ে শিকড়ের মত মাংসপিণ্ড গজানো পাইকগাছার আবুল বাজনদার ভাবতে পারেন নি, তিনি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন।

দেশে আসার পর আবুলকে নিয়ে গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এগিয়ে আসে এদেশের হৃদয়বান কিছু মানুষ। নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ভর্তি করা হয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সরকারিভাবে নেওয়া হয় তার চিকিৎসার দায়িত্ব।
স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়া সেই আবুল এখন অনেকটা সুস্থ্ হয়ে উঠেছেন। তার হাতের আঙুলের অস্তিত্বও এখন দৃশ্যমান। কয়েকমাস পর তিনি ফিরতে পারবেন নিজের বাড়িতে। হাসপাতালে ভর্তির পর তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ থাকলেও এখন তার মুখে প্রশান্তির হাসি।

শুধু আবুল নয়, গত কয়েক মাসে আরো কয়েকটি বিরল রোগে বিদেশি চিকিৎসকদের সহযোগিতা ছাড়াই সাফল্য পেয়েছেন এদেশের চিকিৎসকরা। এ ধরনের চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে ব্যয় তা নির্বাহের জন্য এগিয়ে এসেছেন দেশের হৃদয়বান ব্যক্তিরা। চিকিৎসকরাও সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করে পাশে থেকেছে সংবাদমাধ্যমগুলো।

চিকিৎসকরা বলছেন, বিরল রোগের ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য সকলের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। আগামীতে সকলে মিলে এগিয়ে এলে চিকিৎসকরা আরও মনোবল নিয়ে সেবা দিতে পারবেন।

শুধু রিবল রোগে নয়, সবধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে দিন দিন চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

অপূর্ণাঙ্গ জোড়া শিশু

গত ৭ মার্চ বাগেরহাটের রামপালে জন্ম নেওয়া অপূর্ণাঙ্গ জোড়া শিশু মোহাম্মদ আলীকে ১০ মার্চ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হয়। ২০ জুন দেহে সফল অস্ত্রোপচার করে অপূর্ণাঙ্গ শিশুটিকে অপসারণ করা হয়। এরপর সুস্থ্ হলে ২০ জুলাই পূর্ণাঙ্গ মোহাম্মদ আলীকে মায়ের কোলে তুলে দেওয়া হয়। তবে জোড়া শিশু পৃথক করার প্রথম সাফল্য আসে ২০০৮ সালে।

তিনটি বিরল রোগে আক্রান্ত বীথি

রিবল রোগে আক্রান্ত আরেকজন টাঙ্গাইলের বীথি। তার রোগ একটি নয়, তিনটি। জন্ম থেকেই তার মুখসহ সারাদেহে লোম । সাত বছর বয়সে তার দাঁত পড়ে যায়। পরে তা আর গজায় নি। তৃতীয় সমস্যাটি শুরু হয় ১১ বছর বয়সে। এসময় তার স্তন অস্বাভাবিক আকারে বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চে তার স্তনে জ্বালাযন্ত্রণা শুরু হয়।

মেয়েকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে বাবা-মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল তাকে ভর্তি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অ্যান্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগে।

পরীক্ষায় হরমোন জনিত সমস্যা ধরা না পড়ায় বীথির স্তনে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান ডা. ইকবাল মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রথম দফায় ২০ জুন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩১ জুলাই অস্ত্রোপচার করে বীথির দুই স্তন থেকে মাংস কেটে ফেলা হয়।

বীথির বাবা আবুদর রাজ্জাক জানান, মেয়েকে হাসপাতালে আনার পর যখন তিনি অস্ত্রোপচার সংশ্লিষ্ট খরচ যোগাড়ে দিশেহারা ঠিক তখন ওয়ালটন প্রুপের পক্ষ থেকে বীথির চিকিৎসায় দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও অস্ত্রোপচারে প্রয়োজনীয় রক্ত জোগাড় করে দেওয়া ও আরও বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করা হয়।

বীথির চিকিৎসক ডা. ইকবাল মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি অনেক সময় অনেক রোগীর অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নিতে চাইতাম না। কিন্তু বীথির অস্ত্রোপচারের পর এখন ভাবছি আমি বড় বড় অস্ত্রোপচারে হাত দেবো। কারণ, এ ধরনের ভাল কাজে এখন অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে অনেকেই এগিয়ে আসছেন।

এই চিকৎসক বলেন, ‘বীথির অস্ত্রোপচারে মোট ১০ ব্যাগ ‘ও’ নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত দরকার ছিল।

ট্রি-ম্যানের বক্তব্য

আবুল বাজনদার জানান, সংবাদ মাধ্যমে দেখে ফজলুল বারী নামের এক প্রবাসী তাকে ঢামেকে আনার ব্যবস্থা করেছেন। আর সেই থেকে ফজলুল বারীর হয়ে আবুলের দেখভাল করেন কাজী বাহার। আবুল আরও বলেন, ‘সকলের দোয়া ও সহযোগিতায় আজ আমি অনেকটা সুস্থ। আমি কখনওই চিন্তা করতে পারি নি যে, আমি আমার হাতের আঙুল দেখতে পাবো। এখন নিজের হাতের আঙুল দেখতে পাচ্ছি। এ জন্য আমি সকলের কাছে ঋণী।
এরা ছাড়াও বীথি ও আবুলকে আরও অনেকে তাদের সামর্থ অনুযায়ী সহযোগিতা করেছেন।

বিশেজ্ঞদের বক্তব্য

ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘বাংলাদেশে বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ পাঁচ বেড দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটা এখন পাঁচশ বেডে যাচ্ছে। বিরাট ইনিস্টিটিউট হচ্ছে। এই সাফল্যের উপরে তো আর বড় সাফল্য হতে পারে না। আমি মনে করি চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাফল্য আসছে। হাসপাতালের সাফল্য নির্ভর করে ওয়ার্ড বয় থেকে শুরু করে প্রফেসর পর্যন্ত। শুধু প্রফেসর কাজ করলে হবে না। ওয়ার্ড বয়কেও ঠিকমত কাজ করতে হবে। সুইপারকেও ঠিকঠাক কাজ করতে হবে। প্রত্যেকটা মানুষকে কাজ করতে হবে।’ তিনি সারাদেশের মেডিকেল কলেজে একটি করে বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট করার দাবি জানান।

বিরল রোগের চিকিৎসায় সাফল্য প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, ‘এসব সফলতার মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হল যে, দেশে এখন জটিল রোগের চিকিৎসা সম্ভব। এই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি। আমার ধারণা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার প্রতি দেশের মানুষের আস্থা আছে।

এখানে যত মানুষ আসে আমাদের ক্যাপাসিটি ততটা সেই। প্রতিদিন বহিঃবিভাগে পাঁচ থেকে ছয় হাজার রোগিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দেশের বাইরে থেকে অনেক রোগী আসেন। যেমন আমেরিকা ও ভারত থেকে আসেন। বিরল রোগীর ক্ষেত্রে আমরা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে থাকি। বীথির বিষয়েও আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। ওয়ালটন গ্রুপও বীথিকে নগদ দুই লাখ টাকা দিয়েছে এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে।

ডা. কামরুল হাসান খান মনে করেন, সব রোগের চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। খুব কম রোগের জন্যই যাওয়ার দরকার হতে পারে। দেশের বাইরে গেলে অনেক টাকা লাগে। ঠিক জায়গায় পৌঁছানো যায় না।

‘আমাদের এখানে চিকিৎসায় অনেক সাফল্য থাকলেও সেইভাবে প্রচার হয় না। মানুষ যদি জানতে পারে যে, দেশেই তার রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তাহলে তারা বিদেশে যাবে না। দেশের চিকিৎসা সম্পর্কে সবাইকে জানাতে আরও বেশি প্রচার করা প্রয়োজন। সংবাদ মাধ্যমগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতি অনুরোধ থাকবে তারা যেন বেশি বেশি প্রচার করেন। এতে দেশের মানুষ উপকৃত হবেন।’

তারিখঃ- ১৪/০৯/২০১৬

Share

আরও খবর