বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো৬ জুলাই, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশে সামাজিক সূচকে এখনও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনিসেফের সহায়তার এ জরিপ করে বিবিএস। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিক্স) শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদন রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বিবিএস। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক ড.দিপঙ্কর রায়।

জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হলেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিরাট বৈষম্য বিদ্যমান। এজন্য বৈষম্য নিরসন করা প্রয়োজন। ধনী পরিবারের একজন সদস্য যে সুবিধা পান, সে তুলনায় দরিদ্র পরিবারের একজন সদস্য তার ছিটাফোঁটাও পান না। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পয়ঃনিষ্কাশনসহ অন্যান্য সূচকে ধনী পরিবারের সদস্যরা অনেক এগিয়ে।

জরিপে বলা হয়, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর ৪২ শতাংশই খর্বকায়। এ শিশুদের অর্ধেকের বেশি দরিদ্র পরিবারের। তবে ধনী বা সচ্ছল পরিবারের শিশুদের মধ্যে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কম। এছাড়া বাল্য বিবাহের হারও উচ্চমাত্রায়। বিয়ের বয়সের আগেই ৫৩ শতাংশের বিয়ে হয়। প্রতি ৪ জনের একজনের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ বছরের কম বয়সী খর্বকায় ৪২ শতাংশ শিশুর ৫২.৮ ভাগ দরিদ্র পরিবারের। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী সম্প্রদায়ের শিশুদের মাত্র ২৭ শতাংশ শিশু খর্বকায়। এর মধ্যে জেলাভিত্তিক বিবেচনায় মেহেরপুরে খর্বাকৃতির শিশুর সংখ্যা কম। সবচেয়ে বেশি নেত্রকোনা জেলায়।

জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে এখনও বাল্যবিবাহ উচ্চমাত্রায় প্রচলিত। এ বাল্যবিয়ের হার ৫২.৩ শতাংশ। যাদের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। আর ১৮.১ শতাংশের বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়সের আগেই। ২০ থেকে ৪৯ বয়সী নারীদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের ৩ জন ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয় বলে জরিপে উঠে এসেছে। আবার প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জনের বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়সের আগেই।

সন্তান জন্মদানের সময় স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার বিষয়েও বিরাট বৈষম্যের তথ্য উঠে এসছে জরিপে। সন্তান জন্মদানের সময় ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ মায়ের পাশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা মাত্র ২৬ দশমিক ৫ ভাগ সেবা পান। আর একই ইস্যুতে তুলনামূলক ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এর হার ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ইস্যুতে চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলা সর্বোচ্চ সেবা পায় ও বান্দরবান জেলায় এর হার সবচেয়ে কম।

জরিপের তথ্যানুযায়ী, দেশে ৭৭ শতাংশ উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা পায়। আর ৪ শতাংশ মানুষ খোলা আকাশের নিচে মলত্যাগ করে। দেশের পয়ঃনিষ্কাশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থা মাদারীপুরে আর খারাপ অবস্থা বান্দরবানে।

রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যৌথভাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ইউনিসেফের সহযোগিতায় ৬৪ জেলায় এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ জরিপ চালায় বিবিএস। এতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার পরিবার থেকে।

জরিপে দেশের শিশুর বেঁচে থাকা এবং শিক্ষা, সঠিক সময়ে দুধ খাওয়ানো, শিশু ও নবজাতকের মৃত্যু হার, প্রাক-বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার, বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার হার ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে জরিপের মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন।

Share

আরও খবর