২৩ জুলাই, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। যার অবদান ছিল আকাশসম। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন তিনি।

বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বলতে গেলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরই চলে আসে তাজউদ্দীন আহমদ এর নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বলজ্বলে একটি নাম তাজউদ্দীন আহমদ।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন । সবার কাছেই তিনি সৎ ও মেধাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে বরেণ্য ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বরের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কাহিনী রচিত হয়েছিল । সেখানে তাকে বর্ণনা করা হয়েছিল The Premier of Battle day বা যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

তাজউদ্দীন আহমদ এর ৯৩তম জন্মদিন আজ। ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের গজারি বনের ছায়া ঢাকা কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্ম এই বরেণ্য রাজনীতিকের। বাবার নাম মৌলভি ইয়াসিন খান আর মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা খানম। তাজউদ্দীন আহমদকে জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

চার ভাই, ছয় বোনের মাঝে চতুর্থ তাজউদ্দীন আহমদের পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে। মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ১৯৪৪ সালে অবিভক্ত বাঙলায় দ্বাদশ স্থান লাভ করেন তিনি । এ সময়ই জড়িয়ে পড়েন মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে। নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। একই বছর কোলকাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ভালো পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো উচ্চ মাধ্যমিকেও, ঢাকা বোর্ডে অর্জন করেন চতুর্থ স্থান এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে ছিলো এদেশীয় রাজনীতির প্রতিফলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ তাজউদ্দীন আহমদকে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। জড়িয়ে যান সক্রিয় রাজনীতিতে। পূর্ব বাঙলা ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোক্তাদের একজন।

ভাষা আন্দোলনেও তাজউদ্দীন ছিলেন সোচ্চার কন্ঠ। ১৯৪৮-এর ১১ এবং ১৩ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ধর্মঘট-কর্মসূচি ও বৈঠক করেন। ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ বৈঠকও করেন।

স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সকল আন্দোলনেই তাজউদ্দীন আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর সাফল্যগুলো তাজউদ্দীনের মতো সারথীর কারণেই পাখা মেলতে শুরু করে।

১৯৫৩ সাল। ‘আওয়ামী মুসলীম লীগ’ দলের কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুসলিম’ শব্দটি দলের নাম থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ই আওয়ামী লীগে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তাজউদ্দীন আহমদ। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার মাঝে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেশীয় রাজনীতিতে বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগের প্রভাব। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হন তাজউদ্দীন। প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ নেতা ফকির আব্দুল মান্নানকে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর।

ষাটের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সে অনুযায়ী কর্মকান্ড এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। এ আন্দোলনে রাজনৈতিক বলিষ্ঠ পদক্ষেপের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ ক্রমে হয়ে উঠতে থাকেন ভবিষ্যতের দৃপ্ত সারথি। চলতে থাকে রাজনীতি, গ্রেফতার হন ১৯৬২ সালে। ১৯৬৪ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন আওয়ামী লীগের।

ছয় দফার ঐতিহাসিক ১৯৬৬ সালে হন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৬ সালের ৮ মে পুনরায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন তাজউদ্দীন। মুক্ত হন ১৯৬৯-এর ১২ ফেব্রুয়ারি। আন্দোলন যখন অনিবার্যভাবে একটি সংঘাতময় যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে, তার আগেই শেখ মুজিব দলীয় হাই কমান্ড গঠন করেন। পাঁচ জনের হাই কমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তাজউদ্দীন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত। বাঙালি জাতির উপর নেমে আসে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয়, বীভৎস, খড়গ হস্ত। এ বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এসময় তাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন । ভারতের সমর্থন আদায় করেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেন ও ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করেন।

শত বাধা বিপত্তির মাঝে তিনি প্রবাসী সরকার চালিয়ে যেতে থাকেন। গঠন করেন প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তাই যুদ্ধের সাংগঠনিক পরিকল্পনাও করতে হচ্ছিল তাকে। দেশ থেকে চলে আসার সময় পরিবার পরিজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে না পেরে শুধু একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন স্ত্রীকে- ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও।…’

শেখ মুজিবের ছিল নেতৃত্বের কারিশমা আর তাজউদ্দীন আহমদের ছিলো সাংগঠনিক দক্ষতা। মূলত তার সুনিপুণ দক্ষতার গুণেই যুদ্ধ সঠিক পথে এগোতে থাকে। যুদ্ধের সময় দলের অভ্যন্তর থেকে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তিনি দক্ষতার সাথে সেসব মোকাবেলাও করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্র, শরণার্থী শিবির, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, যুদ্ধদিনে তার পদচারণা যেন সর্বত্র। এভাবেই তিনি স্বাধীনতাকামীদের পথপ্রান্তরে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।সঠিকভাবেই এগোতে থাকে সবকিছু। একসময় পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের।

১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তাজউদ্দীন এক টিভি ভাষণে বলেন-‘৩০ লক্ষাধিক মানুষের আত্মাহুতির মাঝ দিয়ে আমরা হানাদার পশুশক্তির হাত থেকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাঙলাদেশকে স্বাধীন করে ঢাকার বুকে সোনালি রক্তিম বলয় খচিত পতাকা উত্তোলন করেছি’। মুক্তি দাবি করেন জাতির জনকের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদ হন নয়া সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী। ১৯৭৩-এ ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এতোদিন যিনি সংগ্রাম করেছেন দেশ স্বাধীনের জন্য এখন তিনি সংগ্রামে নামেন দেশ গঠনের।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়৷ কারা অন্তরীণ হন তিনিসহ আরও তিন জাতীয় নেতা। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অস্ত্রের দমকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ৪ নেতার জীবন ও শরীর। নিহত হন তাজউদ্দীন আহমদসহ বাঙালি জাতির স্বাধীনতার কান্ডারীরা।

Share

আরও খবর