১৯ জুলাই, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যে তার দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। তুমুল জনপ্রিয় লেখক হিসেবেই মৃত্যুর দরোজা ছুঁয়েছিলেন। মৃত্যুর পরও আজও তার জনপ্রিয়তা এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি। তিনি আমাদের হুমায়ূন আহমেদ। এই বরেণ্য লেখকের ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবস আজ। তাকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায় ও অকৃত্রিম ভালবাসায়।

লেখালেখিতে কেন তিনি জনপ্রিয়তার আকাশ ছুঁতে পেরেছিলেন? এর জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, তার কলমে সমাজ ও জীবনধারার গল্পমালার আঙ্গিক ছিল অন্যদের চাইতে অনেকটাই ভিন্ন এবং রসাত্বক ও বিজ্ঞানস্মত। গল্প বলায় ভাষার ব্যবহারে নিজস্ব একটা কৌশল এবং বর্ণনায় লোকজধারাকে প্রাধান্য দেন। বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছে তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্ম। মানুষের মানচিত্রও উঠে এসেছে তাতে। যা অভূতপূর্ব। হয়তোবা এই জন্যই বাংলা সাহিত্যের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে তাকে পথিকৃৎ বলেন কোন কোন সমোলোচক।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এই অধ্যাপক৷ লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। বলা যায়, নিজ সৃষ্টিগুণে জীবিত সময়কালেই তিনি কিংবদন্তিতুল্য হয়ে উঠেছিলেন।

‘মানুষের যা করতে ইচ্ছা হয় তা করা উচিত, মানুষ আর বাঁচে কত দিন’ উক্তিটি এই জনপ্রিয় লেখকের। কিন্তু মৃত্যুর আগে তার সব ইচ্ছেগুলো তিনি কী পূরণ করতে পেরেছিলেন? হয়তোবা তিনি তার অনেকটাই পেরেছেন কিংবা পারেননি। তবে চিরশায়িত হওয়ার আগে তার শেষ বিদায়ে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, যেভাবে ভক্তদের অশ্রুপাত হয়েছিল, একজন লেখক হিসাবে তা ছিল বিশ্ব ইতিহাসেই নজিরবিহীন। তার মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশে সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব শোকের সৃষ্টি হয়। তার মৃত্যুর ফলে বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

২০১১-এর সেপ্টেম্বর মাসে তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউ ইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না-পড়ায় সহজে তার চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণার কেন্দুয়ার কুতুবপুর গ্রামে হুমায়ূন আহমেদ এর জন্ম। তার পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হুমায়ূন আহমেদকেও আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। মা আয়েশা ফয়েজ। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব তার অনুজ।

হুমায়ূন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক গণ্য করা হয়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক।

বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। তার সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। তার রচিত প্রথম সায়েন্স ফিকশন ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’। ১৯৭২ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘ নন্দিত নরকে ’প্রকাশ পায়। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস‘ শংখনীল কারাগার।’ এই দুটি বই প্রকাশের পর হুমায়ুন আহমেদ একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী হিসেবে পাঠকমহলে সমাদৃত হন। তার নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তবে তার টেলিভিশন নাটকগুলি ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়।

তার প্রকাশিত কিছু উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে, জোছনা ও জননীর গল্প,মধ্যাহ্ন, হিমুর আছে জল, লীলাবতী, হরতন ইস্কাপন, হিমুর বাবার কথামালা, আমিও মিছির আলী, হিমু রিমান্ডে, মিছির আলীর চশমা, দিঘির জলে কার ছায়া গো, আজ হিমুর বিয়ে, লিলুয়া বাতাস, কিছু শৈশব, হুমায়ুন আহমেদের ভৌতিক অমনানিবাস, আগুনের পরশমনি, পাপ ৭১, শ্রাবন মেঘের দিন। তার নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে শংখনীল কারাগার, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া প্রভৃতি। আসলে তার সব বই-ই পাঠকের কাছে পরম সমাদৃত।

সাহিত্যে অবদানের জন্য হুমায়ুন আহমেদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।

প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আজ কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের পরিবারের পক্ষ থেকে নুহাশ পল্লীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নুহাশ পল্লীতে আজ মানুষের ঢল নামবে।

Share

আরও খবর