বন্ধ্যাত্ববন্ধ্যাত্ব বা ইনফারটিলিটি (Infertility) একটি সাধারণ গাইনি অসুস্থতা। যদিও এটা জীবন ঝুঁকিপূর্ণ অসুখ নয় তবুও এই কষ্টের বিশালতা অনেক। এটা দাম্পত্য জীবনের স্বামী-স্ত্রী থেকে পুরো পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় এক সময়।
একটি পরিবারে বন্ধ্যাত্ব হলে স্বামী-স্ত্রী দুজনের যে কারও সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু আমাদের পূর্বের সমাজ ব্যবস্থায় স্ত্রীকেই দায়ী করা হত। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে এটাও উদ্ভাবিত হল যে একজন স্বামীও শারীরিক অথবা মানসিকভাবে বন্ধ্যাত্ব রোগে ভুগতে পারেন।

ইনফারটিলিটির কারণ নানাবিধ। ইনফারটিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব বলতে বোঝায় একজন দম্পতি এক বছর সুস্থ জীবন যাপন করে কোন সন্তান জন্ম দিতে পারেন নাই। এটা গাইনি সমস্যার মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ দেখা দেয়। এতে একজন স্ত্রীর সমস্যা দায়ী শতকরা ৩৩ ভাগ, স্বামীর সমস্যা শতকরা ৩৩ ভাগ এবং কিছু সমস্যা রয়ে যায় Unexplained বা বোঝা যায়না, সেটি শতকরা ৩৩ ভাগ।
মেয়েদের সমস্যার মধ্যে ডিম্বাশয়ের সমস্যা , টিউবের সমস্যা অথবা জরায়ুর সমস্যা থাকতে পারে। এছাড়া মেয়েদের বেশি বয়স একটি বড় সমস্যা, মানসিক চাপ, খাদ্যের অপুষ্টি, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষন এবং মদ্যপান, ধুমপান অথবা মাদকাসক্তিও কারণ হতে পারে। এছাড়া Radiation অথবা কেমোথেরাপিও দায়ী হতে পারে।

অধিক বয়স সন্তান ধারণ ক্ষমতা হ্রাস করে। ৩৫ বছর পর শতকরা ৩৩ জন দম্পতির সন্তানহীনতায় ভোগেন। এসময় ডিম্বাশয়ে ডিমের পরিমাণ কমে যায় এবং গুনাগুণও বদলে যায় তদুপুরি গর্ভপাতের হারও বেড়ে যায়। ৩৫ বছরের নিচে মহিলারা এক বছর নিজেরা চেষ্টার পর ও ৩৫ ঊর্ধ্ব মহিলারা ৬ মাস চেষ্টার পর অবশ্যই ইনফারটিলিটি বিশেষজ্ঞ এর শরণাপন্ন হবেন।

ছেলেদের বেলায় Varicocele অথবা শুক্রকীটের সমস্যা অথবা অন্যান্য অসুখ কারণ হতে পারে চিকিৎসক দম্পতিকে এক সাথে এবং কোন ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পরামর্শ করবেন।

প্রথমত সময় ও মনোযোগ দিয়ে দম্পতির কাছে History নিতে হবে। Conjugal life এর অসুবিধা কিনা জানতে হবে। তারপর Basic পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে- তার মধ্যে আছে স্বামীর Semen Analysis, স্ত্রীর জন্য Ovulation Test, সনোগ্রাফী, হিস্টরস্কপি অথবা ল্যাপারস্কপি।

এই বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার জন্য রয়েছে ঔষধ অথবা সারজিক্যাল ব্যাবস্থা। এছাড়া আছে Artificial Insemination এবং Assisted Reproduction ব্যাবস্থা। পুরো চিকিৎসাটাই কি ধরণের সমস্যা তার উপর নির্ভর করবে। বর্তমানে এই সমস্যা সমাধানে নানা ধরণের সেবনযোগ্য ঔষধ ও ইঞ্জেকশন রয়েছে। এছাড়া IUI পদ্ধতিতে স্বামীর Semen স্ত্রীর জরায়ুতে পৌঁছে দেয়া হয় Tube এর মাধ্যমে। ART (Assisted Reproduction Technology) তে স্ত্রী ডিম্বাশয় থেকে ডিম বাইরে এনে তা স্বামীর শুক্রকীটের সাথে সমন্বয় করে ভ্রুন তৈরী হলে তা আবার স্ত্রীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করে দেয়া হয়। এই পদ্ধতি আজ বহুল শ্রুত IVF বা Test tube পদ্ধতি নামে। এর সাফল্যের হার শতকরা ৩০ ভাগের মত।

গর্ভধারণ করার নানা ধাপ আছে প্রথমত, স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম বহির্গমন হতে হবে। ডিম্বটি Fallopian tube দিয়ে যাবে এবং সেখানে স্বামীর শুক্রকীটের সাথে মিলিত হবে। এই সম্মিলিত ভ্রুন জরায়ুর দিকে যাবে এবং জরায়ুর ভেতরে ঝিল্লি (Endo Metrium) তে গিয়ে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে। এই সকল ধাপের মধ্যে যেকোন জায়গায় বাধাগ্রস্থ হলে দম্পতি সন্তানহীন রোগে ভুগতে পারেন।
কিন্তু আশার কথা এই সকল সমস্যার চিকিৎসায় বিজ্ঞানীরা সচেষ্ট। কোন নিঃসন্তান দম্পতিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুপরামর্শ দিয়ে সাফল্য আনা যায়। আবার কারও বেলায় IVF চিকিৎসার সাহায্য নিতে হয়। কাজেই যিনি বা যে দম্পতি এ ধরণের সমস্যায় আছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে এসে পরামর্শ নিতে দেরী করবেন না।

ডাঃ মরিয়ম ফারুকী (স্বাতী)
এমবিবিএস, এমসিপিএস, এমএস, এফসিপিএস, ডিজিও(গাইনি)
প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালটেন্ট, গাইনি ও অবস বিভাগ
ল্যাবএইড ফারটিলিটি সেন্টার, ঢাকা।
তারিখঃ ০৩/০৩/২০১৬

Share

আরও খবর