১৯ জানুয়ারি, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে ভুলেভরা পাঠ্যবই বিতরণের পর বিব্রত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এনসিটিবির দুই কর্মকর্তাকে ওএসডি ও একজনকে সাময়িক বহিষ্কারের পর প্রতিষ্ঠানটিতে চলছে বদলি আতঙ্ক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে পাঠ্যপুস্তক ভুলের সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না।

মন্ত্রণালয় ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবির বিভিন্ন পদেই আসছে পরিবর্তন। একটি সদস্য পদ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, গবেষণা কর্মকর্তারাও এর বাইরে থাকছেন না।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এসব ভুলের কারণে এনসিটিবি একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছে। আমরা এই কমিটিতেই ক্ষান্ত থাকিনি। মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চ ক্ষমতাবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই এ ব্যাপারে বলা যাবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা এখনই বলব না। এতে তদন্ত রিপোর্ট প্রভাবিত হতে পারে। সংবাদ সম্মেলন করে আগেই বলেছি জড়িতরা রেহাই পাবে না।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এনসিটিবির বিভিন্ন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। এনসিটিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত বিভিন্ন কর্মকর্তার তালিকাও সংগ্রহ করেছেন তারা। এনসিটিবি সদস্য (প্রাথমিক পাঠ্যক্রম) অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান, সম্পাদক গৌরাঙ্গ লাল সরকার, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ওএসডি হওয়া এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক প্রীতিশকুমার সরকার, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। বইয়ে ভুলের কারণ ও কারা এসব সম্পাদনা বা ডিজাইনের সঙ্গে জড়িত তা জিজ্ঞাসাবাদ করছে কমিটি।

এনসিটিবিতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, যারা বইয়ের সম্পাদনা বা ডিজাইনের দায়িত্বে থাকার কথা তারা নিজেরা সেসব দায়িত্ব পালন করেছেন কিনা তা খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক সদস্য বলেন, বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে এত ভুল আগে লক্ষ্য করা যায়নি। এ বছরই প্রথম এমন ভুল হয়েছে। এর গলদ কোথায় সেটি খুঁজে দেখা হচ্ছে। দোষীদের পার পাওয়ার কোনো কারণ নাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সহজভাবে নেবে না। নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছে। আমরা আশঙ্কা করছি এনসিটিবির বিভিন্ন পদে বড় রদবদল আসবে।

আরও জানা যায়, এনসিটিবির সদস্য আবদুল মান্নান ছাগল গাছে পা তুলে আম খাওয়ার যৌক্তিকতার সপক্ষে ব্যাখা দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ভুল স্বীকার না করে ভুলের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এমনটাই মনে করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি। তার বিষয়েও চলছে তদন্ত। দোষী প্রমাণিত হলে তিনিও পার পাবেন না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দায়িত্ব থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে বেশিরভাগ ভুল হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রুহী রহমান বলেন, আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় এর বেশি বলা যাবে না।

এক বিষয়ের শিক্ষক দেখছেন অন্য বিষয় : এনসিটিবিতে নিয়োজিত থাকা কর্মকর্তাদের তথ্যবিবরণীতে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই এমন বিভাগেই বেশিরভাগ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দর্শন নামে কোনো বিষয় না থাকলেও এনসিটিবিতে এই বিষয়ের নয়জন কর্মকর্তা আছেন। এদের মধ্যে পাঁচজনই গবেষণা কর্মকর্তা। তারা কী বিষয়ে গবেষণা করছেন এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রত্যেক ক্লাসে ইংরেজি ও বাংলা, গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয় থাকলেও গণিতে মাত্র একজন কর্মকর্তা আছেন। বাংলায় ছয়জন আর ইংরেজিতে পাঠ শেষ করা কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র তিনজন। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাদে সব শ্রেণিতে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয় থাকলেও এ বিষয়ে পাঠ নেওয়া কর্মকর্তা এনসিটিবিতে মাত্র একজন।

এনসিটিবির একজন সদস্য বলেন, এখানে তো বিষয়ভিত্তিক কর্মকর্তা নিয়োগ হয় না। থাকবে কী করে? কারণ লবিং, তদবির করে এখানে ডাম্পিং হয়ে আসে। পরে অন্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, বিশেষজ্ঞরা কেবল মূল লেখকদের বানান ভুল ও অসঙ্গতিগুলো পরিমার্জন করেন। সব বিষয়ে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না থাকায় এমনটি ঘটেছে। তারপর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া বদলির বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।

Share

আরও খবর