১৭ মার্চ, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮ তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস শুক্রবার। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি (১৭ মার্চ) পালন করবে। দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিবারের মত এবারও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনে গোটা জাতি স্মরণ করবে, ‘..এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান? / যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান / যতকাল রবে পদ্মা যমুনা / গৌরী মেঘনা বহমান / ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান..।’

দুইশ বছরের পরাধীনতার জিঞ্জির ছিঁড়ে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙালির দীর্ঘ নয় মাস মৃত্যুপণ জনযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করে তাদের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন, প্রিয় স্বাধীনতা। পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ-বঞ্চনা, ঔপনিবেশিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধু। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পাকিস্তানী জল্লাদরা কারাবন্দি রেখে কবর খুঁড়েও যাকে হত্যা করার সাহস পায়নি; সেই হিমালয়সম ব্যক্তিত্বের অধিকারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে একাত্তরের পরাজিত শক্তির পেতাত্মা নরপিশাচ ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতার পালাবদল হয় বাংলাদেশে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের হয়ে কাজ করা ঘাতক চক্রের বুলেটে সেদিন ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড। কিন্তু তারপরও একটি জাতি ও অবহেলিত মানুষের মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে বঙ্গবন্ধু শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বেই ইতিহাস হয়ে রয়েছেন। নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধের কারণে বাঙালি জাতির জনক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন বঙ্গবন্ধু।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের তৃতীয় সন্তান। ৭ বছর বয়সে তিনি পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন। মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার সময় বঙ্গবন্ধু বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে কলকাতায় তার চোখের অপারেশন হয়। এই সময় কয়েক বছর তার পড়াশোনা বন্ধ থাকে। ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই সময় ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি শীর্ষ রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। যার জন্য জীবনে তিনি জেল-জুলুম-হুলিয়া কোনোকিছুই পরোয়া করেননি। দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামে তিনি শত যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট-বেদনা সহ্য করেছেন, ফাঁসির মঞ্চও যার কাছে ছিল তুচ্ছ; তিনি হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান।

দিবসটি উপলক্ষে দুই দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। কর্মসূচির মধ্যে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। এরপর সকাল দশটায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রতিনিধিদল টুঙ্গীপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণসহ বাদ জুমা দোয়া ও মিলাদ মাহফিল কর্মসূচি পালন। টুঙ্গীপাড়ার এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত থাকবেন। এরপর ১৮ মার্চ শনিবার বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এসব কর্মসূচি যথাযোগ্যভাবে পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শিশু-কিশোরকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাঙালির চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তার কর্ম ও আদর্শ জাতির মাঝে বেঁচে থাকবে চিরকাল।’ তিনি জাতির পিতার ৯৮তম জন্মদিবসে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে দেশের প্রকৃত ইতিহাস এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং দেশের সকল শিশুসহ দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালি জাতিরই নয়, তিনি ছিলেন বিশ্বের সকল নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় ও মুক্তির অগ্রনায়ক। আসুন, সবাই মিলে জাতির পিতার অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলি। আজকের দিনে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।’

Share

আরও খবর