৩০ ডিসেম্বর, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ শেষ হতে চলেছে আরো একটি বছর। আর কয়েকদিন পরেই ২০১৬ শেষ হয়ে শুরু হবে নতুন আর একটি বছর-২০১৭। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ২০১৬ সালে প্রযুক্তি খাতেও ঘটেছে অনেকগুলো আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা।

এককথায় বলতে গেলে ২০১৬ সালটি প্রযুক্তিখাতের জন্য একটি ঘটনাবহুল একটি বছর। এ বছর প্রযুক্তিখাতে ঘটেছে অনেকগুলো বড় বড় কেলেঙ্কারি যা সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়ে গেছে।

স্মার্টফোনে ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগা থেকে শুরু করে বড় বড় হ্যাকিং- মোটকথা এমন কোনো কেলেঙ্কারি নেই যা এ বছর ঘটেনি। কারো বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে আবার কেউ সহজেই বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। হয়েছে একাধিক পেটেন্ট মামলাও। তবে আশার কথা হল এ বছর অনেকগুলো নতুন স্টার্টআপের পথচলা শুরু হয়েছে।

কিন্তু বছর শেষে সব ছাপিয়ে কেলেঙ্কারিগুলোই রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রযুক্তি খাতে চলতি বছরের আলোচিত ২০টি কেলেঙ্কারি নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনে আজ পর্বে প্রথম ১০টি ঘটনা তুলে ধরা হল।

জেনফিটস এর সিইও’র হঠাৎ পদত্যাগ : গত ফেব্রুয়ারিতে দ্রুত বিকাশমান ক্লাউডভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি জেনফিটসের এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পার্কার কনরাড হঠাৎ পদত্যাগ করে বসেন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কনরাড খুব উদাসীন ছিলেন। ফলে জেনফিটস দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এছাড়াও জেনফিটসের কার্যালয়ের সিঁড়িতে মদ ও বিয়ারের বোতল, সিগারেট ও প্লাস্টিকের কাপ পড়ে থাকতে দেখা যেত।

এরপর অনিশ্চিতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়া কোম্পানিটির সিইও’র স্থলাভিষিক্ত হন ডেভিড স্যাকস। কিন্তু নভেম্বরে, দীর্ঘ ১০ মাস দায়িত্ব পালনের পর স্যাক্সও পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এক ইয়েল্প কর্মীর খোলা চিঠি : মার্কিন বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি ইয়েল্পের একজন কাস্টমার সার্ভিস কর্মী কোম্পানির সিইও জেরেমি স্টপেলম্যান বরাবর এক খোলা চিঠি লিখার মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেন। টালিয়া জেন নামের ঐ কর্মী চিঠিতে অভিযোগ করেন যে ইয়েল্পে কাজ করে সান ফ্রান্সিসকোয় বসবাস করার মতো যথেষ্ট মজুরি তারা পান না। এছাড়াও প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মীদের অন্য কোথাও খণ্ডকালীন চাকরি করতেও চাপ দেয়া হয়। খোলা চিঠি লেখার মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েল্পের ওই কর্মী তার চাকরি হারান।

যৌন কেলেঙ্কারি মামলায় গোকার মিডিয়ার বিরুদ্ধে হাল্ক হোগানের জয় : ২০১২ সালে বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের টেপ প্রকাশ করায় অনলাইন মিডিয়া গোকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন পেশাদার কুস্তিগির হাল্ক হোগান। গত মার্চে হোগান অনলাইন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির মামলায় জয় পান। মামলায় হারার ফলে হাল্ক হোগানকে ১১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয় গোকারকে।

গত জুনে কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ক্রেতা খুঁজতে শুরু করে। অবশেষে আগস্টে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার দামে ইউনিভিসন কোম্পানিটিকে কিনে নেয়।

ডান্স পার্টিতে স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ভাড়া করায় তোপের মুখে মাইক্রোসফট : এ বছর মার্চে অনুষ্ঠিত হয় মাইক্রোসফটের ডেভেলপার সম্মেলন। কিন্তু ডেভেলপারদের জন্য আয়োজিত সম্মেলন পরবর্তী পার্টিতে নাচ-গানের জন্য স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের ভাড়া করায় ব্যাপক তোপের মুখে পড়ে কোম্পানিটি। অবশ্য ঘটনার পর পরই এক বিবৃতিতে বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া হয় কোম্পানিটির পক্ষ থেকে।

ব্লাড টেস্টিং স্টার্টআপ থেরানোস সিইও এর পদত্যাগ : ব্লাড টেস্টিং স্টার্টআপ থেরানোসকে ঘিরে সমস্যার সূত্রপাত মূলত গত বছরের শেষ দিক থেকে। তবে চলতি বছরকেই প্রতিষ্ঠানটির জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ গত এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ফলশ্রুতিতেচলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) সানি বলওয়ানি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এলিজাবেথ হোমস পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বিতর্কিত স্ন্যাপচ্যাটের ফিল্টার : গত এপ্রিলে গায়ক বব মার্লের স্মরণে স্ন্যাপচ্যাট একটি ফিল্টার চালু করে, যা ফটো মেসেজিং সেবাটির সিস্টেম ঘিরে এক ধরনের সমস্যা তৈরি করে। ফলে শুরু থেকেই এটি বিতর্কিত হয়ে দাঁড়ায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় স্ন্যাপচ্যাট কর্তৃপক্ষের কাণ্ডজ্ঞান নিয়েও সে সময় অনেকে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে একজন গায়ককে নিয়ে বিশেষ ফিল্টার তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

দুর্ঘটনার কবলে স্বনিয়ন্ত্রিত টেসলা গাড়ি : গত মে মাসে স্বনির্দেশকারী মোডে থাকা অবস্থায় একটি টেসলা গাড়ি একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটায়। স্বনির্দেশকারী মোডে টেসলা মডেল এস এর গাড়িটি চালানোর সময় ফ্লোরিডার একজন চালক বাম দিকে ঘুরতে যাওয়া একটি ট্রাক গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যান। স্বনিয়ন্ত্রিত গাড়ি কর্তৃক মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম। যেখানে স্বনির্দেশকারী সিস্টেমে থাকা গাড়িটি একটি উজ্জ্বল আকাশ বিপরীতে সাদা ট্র্যাক্টরটিকে লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।

নোংরা মামলার শিকার হাইপারলুপ ওয়ান : গত জুলাই মাসে কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং সিটিও ব্রোগান ব্যামব্রোগান প্রকাশ্যে পদত্যাগ করেন এবং বিনিয়োগকারী ও চেয়ারম্যান সারভি পিশেভার, তার ভাই আফশিন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রবার্ট লয়েড এবং ভাইস-চেয়ারম্যান জোসেফ লন্সডেইল এর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তার মামলায় ব্যামব্রোগান দাবি করেন যে হাইপারলুপ এক কর্তাব্যক্তি তহবিল এর অপব্যবহার করেছেন, তাদের জিম্মাদারের দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছেন এবং ক্যালিফোর্নিয়া শ্রম কোড লঙ্ঘন করেছেন এবং এমনকি অভিযুক্ত তার ডেস্কে একটা ফাঁসির দড়ি রেখে এসেছিলেন। সারভি পিশেভারও তখন কোম্পানি ত্যাগ করেন।

পাল্টা মামলায় হাইপারলুপ ওয়ান ব্যামব্রোগানের বিরুদ্ধে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দখলের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তবে নভেম্বরে হাইপারলুপ ওয়ান ব্যামব্রোগানের সহ সাবেক কর্মচারীদের সঙ্গে সমঝোতায় আসে।

দোকান থেকে ডিমবিহীন মেয়োর বয়াম কিনতে মানুষ ভাড়া করে হ্যাম্পটন ক্রিক : গত আগস্টে এ সত্যটি প্রকাশ হয়ে যায় যে হ্যাম্পটন ক্রিক, ‘জাস্ট মেয়ো’ নামক একটি ডিমবিহীন মায়ো পণ্য কিনতে ২০১৪ ২০১৫ সাল পর্যন্ত তার কর্মচারীদের দায়িত্ব দিয়েছিল।এই ‘চোরাগোপ্তা’ প্রকল্পটির পিছনে তাদের ব্যয় হয়েছিল ৭৭,০০০ ডলার এবং উদ্দেশ্য ছিল মান নিয়ন্ত্রণে পরিদর্শন এবং অনুকরণ করা যে একটি মুদি দোকানে পণ্য কেনার অভিজ্ঞতা কেমন হয়। পরে মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট হ্যাম্পটন ক্রিক কোনো আইন ভঙ্গ করে অপরাধ করেছে কিনা তা নির্ধারণ করতে তদন্ত শুরু করে।

ইইউ কর্তৃক অ্যাপলকে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার কর দেয়ার আদেশ : গত আগস্টে ইউরোপীয় কমিশন প্রথমবারের মতো অ্যাপলকে এত বড় শাস্তি দেন যেখানে ইইউ আয়ারল্যান্ডকে আদেশ দেন অ্যাপলের কাছ থেকে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার কর আদায় করার জন্য। কারণ ইইউ জানতে পেরেছিল যে, আয়ারল্যান্ড বছরের পর বছর ধরে অ্যাপলকে একটি অবৈধ ট্যাক্স বেনিফিট মঞ্জুর করে আসছে যাতে এটি অন্যান্য ব্যবসার চেয়ে কম কর দিয়ে পার পেতে পারে।ডিসেম্বরে অ্যাপল ইইউ সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেয়।

Share

আরও খবর