গর্ভবতীপ্রজনন স্বাস্থ্য মূলত সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরই একটি অংশ কারণ প্রজনন স্বাস্থ্য ভাল না থাকলে সার্বিকভাবে সুস্থ থাকা যায়না। আমরা মনে করে থাকি কিশোর কিশোরীরা যখন পুর্ন বয়স্ক মানুষ বা তরুণ তরুণী হয় তখনি হয়ত প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয়, এ ধরনের অজ্ঞতা থেকে অনেক ভুল ধারনার সৃষ্টি হয়। শৈশব থেকেই আসলে প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয় কারণ একটি শিশু যদি ঠিকমত পুষ্টি না পায়, তাহলে তার প্রজনন অঙ্গগুলো ঠিকমত বেড়ে উঠবে না। সন্তান জন্মদানের সাথে জড়িত পুরুষ ও মহিলার প্রজনন অঙ্গসমূহের সামগ্রিক সুস্থতা এবং এর সাথে মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাকে প্রজনন স্বাস্থ্য বলা হয়ে থাকে। সাধারণভাবে বলা যায়, প্রজনন স্বাস্থ্যের মাধ্যমে মানুষ সুস্থ ও নিরাপদভাবে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, সুস্থভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা রাখে এবং তা কখন ও কিভাবে করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।

মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত রোগগুলোকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায় যেমন, জিনগত বা জন্মগত অস্বাভাবিকতা, ক্যান্সার, যৌনবাহিত রোগ এবং শারীরিক ক্ষতি, মানসিক বিষয় এবং অন্যান্য কারণ। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল যৌন সন্তুষ্টির অভাব এবং ইনফারটিলিটি।

নিরাপদ মাতৃত্ব, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ, যৌনবাহিত রোগ, এইডস, মায়ের পুষ্টি, বিপজ্জনক গর্ভপাত ও প্রতিকার, কিশোর বয়সে প্রজনন স্বাস্থ্য, বন্ধাত্বের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ, নবজাতকের যত্ন ইত্যাদি প্রজনন স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশের নারীরা শুধুমাত্র গর্ভকালিন সময়ে পুষ্টিকর খাবার, টিকার বিষয়টি জানলেও বিশ্রামের বিষয়ে সচেতন নন অনেকেই। সন্তান প্রসবের পরের যত্ন ও নিয়ম সম্পর্কে একেবারেই অবগত নন। ফলে পরবর্তি সন্তান ধারণ ত্বরান্বিত হয় এবং মা আবার অপুষ্টিসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া, ঘন ঘন বাচ্চা নেয়া, অসতর্ক সহবাস, পিরিয়ডকালিন অপরিচ্ছন্ন থাকা ইত্যাদি বিষয় গুলি প্রজনন স্বাস্থ্যকে ভীষণভাবে ব্যাহত করে।

বাংলাদেশ প্রজনন স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, এদেশে ৮০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বা তারও কম বয়সে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ নারী ২০ বছর বয়সের আগেই গর্ভধারন করেন। আমাদের দেশে শতকরা ৭০ ভাগ গর্ভবতি মা রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভোগেন। প্রতি লাখে ৩২০ জন মায়ের মৃত্যু হয়।

প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য আসলে নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই বরং জন্মের পর থেকে শিশু বয়স, বয়ঃসন্ধিকাল, প্রজননক্ষম বয়স এমনকি প্রজনন বয়সের পরবর্তি জীবনের জন্যও স্বাস্থ্যসেবা নেয়া উচিত। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে আকস্মিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন কিশোর কিশোরীদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন জন্ম দেয়। এ সময় তাদের বেড়ে উঠা ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে নানা তথ্যের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি বয়ঃসন্ধিকালিন ছেলেমেয়ের প্রজনন অঙ্গের যত্ন নিতে হবে। প্রতিদিন প্রজনন অঙ্গ পরিষ্কার করা দরকার। প্রজনন অঙ্গে কোন ঘা বা চুলকানি দেখা গেলে লজ্জা না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রজনন অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে, এই অধিকার শুধু নারীর নয় বরং নারী ও পুরুষ উভয়েরই শরীর ও মন নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়। পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারে স্বামী স্ত্রী দুজনে আলোচনা করে পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা আছে তবে সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে তা নির্ভর করে পুরুষের বীর্যে যে শুক্রাণু আছে তার উপড়ে।

প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অন্যতম উপাদান বন্ধাত্ব। বন্ধাত্বের জন্য মহিলারাই দায়ী এমন একটি ভ্রান্ত ধারনা আমাদের সমাজে বহুলভাবে প্রচলিত থাকলেও গবেষণায় দেখা গেছে, এক তৃতীয়াংশ পুরুষ, এক তৃতীয়াংশ মহিলা এবং বাকি তৃতীয়াংশ উভয়ের কারণে বা অজানা কারণে ঘটে থাকে। ৩৫ অনুর্ধ মহিলার ক্ষেত্রে ১ বছর এবং তার বেশি বয়সি মহিলার ক্ষেত্রে ছয় মাসের চেষ্টায় অন্তঃসত্বা হতে ব্যর্থ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধাত্ব একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা। সামাজিক সংস্কারের কারণে অথবা লোক লজ্জার ভয়ে নিজেদেরকে আর গুটিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশেই এখন প্রজনন চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি সাফল্যের সাথে উচ্চতর প্রযুক্তির এই সেবাদান কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সবশেষে বলা যায়, প্রজননতন্ত্রের সুরক্ষা মানুষের জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ন বিষয়। আমাদের দেশে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষেরই সচেতনতার অভাব রয়েছে আর তাই সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।

Dr. Rehnuma Jahan,
Consultant- OBGYN

তারিখঃ ১৪/০২/২০১৬

Share

আরও খবর