আমার কথা শুনে অনেকেই ভাবছেন আদা ব্যাপারী নিচ্ছে জাহাজের খবর। কারণ, আমি পরিবহন মালিকও না, শ্রমিকও না। তবে আমি কেন জানতে চাই? আমি জানতে এই কারণে যে,

১. মালিক শ্রমিক কেউই বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসে রাস্তায় চাঁদা দেয় না। তাঁদের বাপ দাদার সম্পত্তি থেকেও দেয় না। রাস্তায় যাত্রীদের মানে আমাদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া নিয়েই চাঁদা দেয়।

২. যেহেতু সাধারণ শ্রমিকরাও দেশের নাগরিক। দেশের জিডিপিতে তাদের ভূমিকা রয়েছে। তাই তাদের উপার্জিত টাকা লুটপাট হচ্ছে তা জানতে চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে।

৩. সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা সারাদিন পরিশ্রম করে আর অবস্থার উন্নতি হয় লুটেরা শ্রেণির। এটা বন্ধ করতে হলে শ্রমিকদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দরকার হবে। এবং তা করতে হবে সাধারণ জনগণকে। তাই আম জানতা হিসেবে, বাসে বর্ধিত ভাড়া প্রদানকারী হিসেবে, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ( পন্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ে) একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আমার চাঁদাবাজির টাকা কী হয় তা জানার অধিকার আমার এবং আমাদের আছে।

পরিবহন খাতের সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয় শ্রমিক কল্যাণের নামে। শ্রমিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য কি একটা হাসপাতাল হয়েছে? চালক শ্রমিকদের কে বীমার আওতায় আনা হয়েছে? একটি ফ্যাক্টরিতে কর্মরত অবস্থায় কোন শ্রমিক দূর্ঘটনায় পতিত হলে যে সুবিধা প্রাপ্য হন, পরিবহন খাতে কি তা প্রযোজ্য হয়েছে? পরিবহন চালক শ্রমিকদের সন্তানের পড়াশোনার ব্যবস্থা কি মালিকপক্ষ করেছে? এমনকি পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের পেশাগত মানোয়ন্নের কোন পদক্ষেপ কি মালিক পক্ষ বা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা নিয়েছে ? নেয়নি। তাহলে গত চারদশকের চাঁদাবাজির হাজার হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়? পরিবহন খাতের শ্রমিক কারা? অধিকাংশ শ্রমিকই ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর অংশ। এরা অত্যন্ত দরিদ্র শ্রেণির। পড়াশোনা করার মত সামর্থ তাদের থাকে না। বাঁচার একটা অবলম্বন খুঁজতে খুঁজতে রাস্তায় এসে গাড়ির হেলপার হয়ে শুরু করে সড়ক জীবন। যেহেতু, তাদের পক্ষে যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করা সম্ভব হয় না। তাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন মেসেজ তাদের কাছে সোজা পথে সহজ আকারে যায় না। এবং অজ্ঞতার কারণে এই শ্রেণিকে অতিদ্রুত উত্তেজিত করা সহজ। এদের মধ্যে সহজেই গুজব ছড়ানোও সহজ। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণি এই অসহায় চালক শ্রমিকদের অন্ধকারে রাখতে পছন্দ করেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এই প্রথাকে সমর্থন করেন। শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর জনগণের পকেটের টাকা দুটো ভোগ করেন উচ্চ শ্রেণির কিছু লুটেরা বাটপারগোষ্ঠী। শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, একমাত্র আইন করেই বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের জিডিপির উন্নয়নে যদি পরিবহন চালক শ্রমিকদের বিন্দুমাত্র ভূমিকা আছে বলে মনে করি, তাহলে শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে এই কথা স্বীকার করতেই হয়। রাষ্ট্র কি চালক শ্রমিকদের প্রতি সেই দায়িত্ব পালন করেছে বা করতে পেরেছে? পারেনি। এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস চালক শ্রমিকদের কোন নিয়োগ পত্র দেয়া হয় না। চুক্তিতে গাড়ি চালাতে হয়। যদি, চালক শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা, পেশাগত মর্যাদা, পেশাগত আর্থিক নিশ্চয়তা, চিকিৎসা সুবিধা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায় তবে অবস্থার পরিবর্তন হবে। চালক শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। লুটেরা শ্রেণি ( মালিক ও নের্তৃবৃন্দ) চালক শ্রমিকদের কে সচেতন করবে না, কারণ তাদের স্বার্থ নষ্ট হবে। তাই সমাজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থ আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সেজন্যেই সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমাদের ভূমিকা রাখতে হবে।

Share

আরও খবর