মাইকেল জ্যাকসন২৯ আগস্ট, বিনোদন ডেস্কঃ `পপ কিং` মাইকেল জ্যাকসন। এই বিখ্যাত শিল্পীকে জানেনা, এমন কোন সঙ্গীত শ্রোতা খুঁজে পাওয়া যাবেনা। শিল্পী হিসেবে পুরো বিশ্বে তার খ্যাতি ছিলো। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে সর্বকালের সবচেয়ে সফল শিল্পী তিনি। ১৩টি গ্র্যামি পুরষ্কার, ১৩টি ১নম্বর একক সঙ্গীত, এবং ৭৫ কোটি অ্যালবাম বিক্রির রেকর্ড রয়েছে তার। বলা যায়, আজীবনই তিনি সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়েছিলেন। কিংবদন্তী এই সঙ্গীত শিল্পীর জন্মদিন আজ।

পুরো নাম মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। ১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট জন্ম তার। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৫৮ বছর। বাবা জোসেফ ওয়াল্টার জ্যাকসন ও মা ক্যাথরিন জ্যাকসন। পাঁচ ভাই ও তিন বোন, সবাই কোন না কোন সময় পেশাগতভাবে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ছোট বোন জ্যানেট জ্যাকসন একজন সফল সংগীত শিল্পী।

মাইকেল জ্যাকসন ১৯৬৩ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পেশাদার সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। গায়ক হিসেবে জ্যাকসনের উত্থান কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই। তিনি তখন জ্যাকসন ফাইভ নামের সঙ্গীত গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে গান গাইতেন। ১৯৭১ সাল থেকে মাইকেল একক শিল্পী হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। মাইকেলের গাওয়া পাঁচটি সঙ্গীত অ্যালবাম বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত রেকডের্র মধ্যে রয়েছে- অফ দ্য ওয়াল (১৯৭৯), থ্রিলার (১৯৮২), ব্যাড (১৯৮৭), ডেঞ্জারাস (১৯৯১) এবং হিস্টরি (১৯৯৫)।

মাইকেল জ্যাকসনের বাবা জোসেফ জ্যাকসন একটি কারখানায় চাকরি করতেন। এর পাশাপাশি ভাই লুথারকে নিয়ে ‘দি ফ্যালকন’ নামের একটি ব্যান্ড দল বানিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় তিনি গান গেয়ে বেড়ান। বলা যায় শ্রমিকের কাজ করলেও গানের প্রতি বেশ দুর্বলতা ছিলো তার। এই দুর্বলতা তার ছেলে-মেয়েদের উপরেও বেশ প্রভাব ফেলেছিল, বিশেষ করে তার ৯ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সপ্তম ছেলেটির উপরে। আর তা এতটাই যে, পরবর্তীতে তিনিই হয়ে ওঠেন বিশ্বের ‘কিং অফ পপ’।

১৯৮০র দশকে মাইকেল সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী যিনি এমটিভিতে এতো জনপ্রিয়তা পান। বলা হয়, তার গাওয়া গানের ভিডিওর মাধ্যমেই এমটিভির প্রসার ঘটেছিলো। গানের তালে তালে মাইকেলের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রবোট, ও মুনওয়াক (চাঁদে হাঁটা) রয়েছে। মুনওয়াক আসলে হলো সামনের দিকে হাঁটার দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করে পিছনে যাবার ভঙ্গিমা। এখনও সারাবিশ্বের খ্যাত নৃত্যশিল্পীদের কাছে মাইকেল জ্যাকসনকে শ্রদ্ধা কুড়ান।

পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটেছে অসাধারণ গাইয়ে তারকার, যার আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে- এটা যেমন মানুষের কাছে অজানা ছিল; ঠিক তেমনি কেউ জানতো না, তার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে এতো তাড়াতাড়ি মাত্র ৫০ বছর বয়সেই। বিখ্যাত এই পপ গায়ক মৃত্যুবরণ করেন ২০০৯ সালের ২৫ জুন।

মৃত্যুর পর সংগীতের ইতিহাসে জনপ্রিয়তার হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে দিয়েছেন মাইকেল জ্যাকসন, গড়েছেন নিত্যনতুন সব রেকর্ড। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাওয়ার পর সে বছরই সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবামের শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন জ্যাকসন। মৃত্যুর এক বছরের মাথায় কেবল আমেরিকাতেই তার অ্যালবাম বিক্রি হয় ৮.২ মিলিয়ন কপি। আর বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয় ৩৫ মিলিয়ন।

মৃত্যুর পর গান ডাউনলোডের ইতিহাসেও রেকর্ড গড়েন `পপ কিং`। জ্যাকসনের মৃত্যুর পর তার নির্বাচিত গান নিয়ে প্রকাশিত তিনটি অ্যালবাম এত বেশি বিক্রি হয় যে, কোন জনপ্রিয় শিল্পীর নতুন অ্যালবামও এত বিক্রি হয়নি। এ ছাড়া এক বছরে সর্বাধিক বিক্রীত সেরা বিশের তালিকায় জায়গা করে নেয় জ্যাকসনের চার-চারটি অ্যালবাম। আমেরিকার সংগীতের ইতিহাসে আর কোন শিল্পীর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি।

২০১৫ সাল পর্যন্ত জ্যাকসনের গানের পরিবেশক সংস্থা হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল সনি মিউজিক। কিন্তু পপ কিংয়ের মৃত্যুর পর তার গানের বিক্রি ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ায় ২০১০ সালে জ্যাকসন এস্টেটের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করে সনি মিউজিক। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত জ্যাকসনের গানের স্বত্ব কিনে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

২০১০ সালের নভেম্বরে জ্যাকসনের অপ্রকাশিত গান নিয়ে `মাইকেল` শিরোনামের অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণা দেয় সনি মিউজিক। অ্যালবামটি মুক্তি পায় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। এর গানগুলোতে জ্যাকসনের সঙ্গে আরও কন্ঠ দিয়েছিলেন একন, ফিফটি সেন্ট প্রমুখ। এই অ্যালবামের জন্য জ্যাকসন এস্টেটের সঙ্গে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে সনি মিউজিক। একক কোন গায়কের সঙ্গে সবচেয়ে ব্যয়বহুল চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় এটি। আসলে জীবিত মাইকেলের মতো মৃত মাইকেলও ছিলেন বিস্ময়কর। তার জনপ্রিয়তাই সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বারবার। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, মৃত্যুর এতগুলো বছর পরও তিনিই বিশ্বসেরা। তার জনপ্রিয়তার জায়গাটি কেউ দখলে নিতে পারেনি।

এই কিংবদন্তীকে নিয়ে ঘটনার শেষ নেই। ২০০৫ সালে চাঁদে ১২০০ একরের প্লট কিনেছিলেন `পপ কিং` মাইকেল জ্যাকসন। তার মৃত্যুর পর চাঁদের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নাম পরিবর্তন করে `মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন` রাখা হয়। জ্যাকসনকে সম্মান জানাতেই এমনটা করেছিল দ্য লুনার রিপাবলিক সোসাইটি।

২০০৯ সালের মার্চে মঞ্চে ফিরে আসবেন ঘোষণা দিয়ে ভক্তদের মাঝে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেন। তিনি আবারো আগের মতো ‘পারফর্ম’ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, ‘দিস ইজ ইট’ নামের শো দেখার জন্য টিকিট কেনার ‘ক্রেজ’ প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়। দুঃখজনক ভাবে লন্ডনে প্রথম শো করার ঠিক ১৮দিন আগেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুসংবাদ।

Share

আরও খবর