১৬ সেপ্টেম্বর, অনলাইন ডেস্কঃ চালের বাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে খুচরা বাজারে বিভিন্ন মানের চালের দাম কেজিপ্রতি ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী অনুপ্রবেশ ও ভারত চাল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে— এমন গুজব ছড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চালের দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যবসায়ী পর্যায়ে অস্বাভাবিক মজুদ তদারকির উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে খোলা বাজারে মানভেদে মিনিকেট প্রতি কেজি ৬২-৬৫ ও নাজিরশাইল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মোটা চাল বিআর-২৮ ও সোনালি বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৫ টাকা দরে। ফলে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাজারে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। সরকার চাল সংগ্রহের নানা উদ্যোগ নিলেও কাজে আসছে না।

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম আরও বাড়তে পারে। চাল আমদানি উৎসাহিত করতে সরকার ২৮ শতাংশ থেকে শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশ করলেও ভারত চালের রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে দেওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়ছে না। এমন অবস্থায় দাম স্থিতিশীল রাখতে মিয়ানমার থেকে চাল আনছে সরকার। ইতিমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যে কোনো দিন এ চাল বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এদিকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী বুধবার খোলা বাজারে চাল বিক্রি শুরু করবে সরকার।

সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদফতরের গুদামে যেখানে ৬ লাখ টন চাল থাকার কথা সেখানে আছে মাত্র সোয়া ৩ লাখ টন। বিভিন্ন কারণে খাদ্য বিভাগ মজুদ বাড়াতে পারেনি। তবে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত চাল আসতে শুরু করেছে। এ ছাড়া আর দেড় মাস পরই নতুন চাল উঠতে শুরু করবে। তবে বন্যা ও হাওর এলাকা তলিয়ে যাওয়ার প্রভাবে বর্তমানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে খাদ্য বিভাগ।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘সরকারের অক্ষমতাকে ব্যবসায়ীরা কাজে লাগিয়েছেন। সরকার চালের জন্য কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে সরকারের সরবরাহ বৃদ্ধি করার ক্ষমতা নেই। ’ জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দাম বেশি বাড়ার আর কোনো কারণ নেই। বাজারে চালের অভাব নেই। যথেষ্ট মজুদ আছে। ’

বাজার ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সব ধরনের চালের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এ বাজারে মিনিকেট চালের জোগান আসে কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে। সেখান থেকে দিনে প্রায় ১০০ ট্রাক চাল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। মজুদ কম থাকায় সেখান থেকে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, মিনিকেটের দাম বাড়ায় সরবরাহ কমেছে। এ ছাড়া দফায় দফায় চালের দাম বাড়ার ব্যাপারে মিল মালিকরা দেশে ধানের সংকট চলছে বলে দাবি করছেন। দেশে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টন ধান উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৫৫ শতাংশ আসে বোরো মৌসুমে। গত বোরোতে হাওরে ফসলহানি ও বন্যায় উৎপাদন ২০ লাখ টন কম হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে চাল। গত দুই দিনে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই দিন আগে বাজারে প্রতি বস্তা ভারতীয় আতপ চাল বিক্রি হয়েছে ২০৮০ থেকে ২১০০ টাকা, কিন্তু গতকাল বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২৫০ থেকে ২৬০০ টাকা। ২৪০০ টাকার স্বর্ণা চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ২৬০০ টাকায়। ২২০০-২৪০০ টাকার মিনিকেট (আতপ) বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ থেকে ২৬৫০ টাকা। তা ছাড়া প্রতি বস্তা আটাশ বিশি ২২০০ টাকা, দেশি পাইজাম (আতপ) ২১০০ টাকা, নূরজাহান ২৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, চট্টগ্রামের সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। যেখান থেকে চাল আমদানি করা হয় সেখানেই দাম বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারকেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ থেকে জানান, খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা নওগাঁ দেশের ধান-চালের মোকাম। জেলার ১১ উপজেলায় ১ হাজার ১৬৭টি চালকল রয়েছে। প্রতি বছর এ জেলা থেকে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়। ঈদুল আজহার পর থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ইরি-বোরো মৌসুমে বন্যা ও বালাইয়ে ৫০-৬০ লাখ মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। পরে কৃষক আমনের আবাদ শুরু করলে দুবারের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে দেশে ধানের সংকট সৃষ্টি হয়। ভারতে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাবও পড়েছে চালের বাজারে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম পুনরায় বেড়ে গেছে। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য সরকার দেশে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও প্রতিবেশী ভারত চালের দাম বাড়িয়েছে। আগামীতে যদি ইরি-বোরো মৌসুমে শতভাগ ফসল উৎপাদন হয় তাহলে বাজার স্থিতিশীল হবে। ’

নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘বন্যার কারণে নওগাঁয় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া ভারতে চালের দাম বাড়ায় স্থানীয় বাজারে বর্তমানে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। কেউ যাতে চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখছি। আশা করি স্বল্প সময়ে চালের বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ’

খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা শেরপুরে প্রতি বছর ২ লাখ ৬৫ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়। চলতি বছর মজুদের পরিমাণ নিয়ে জেলা খাদ্য বিভাগ নাজুক অবস্থায় পড়েছে। ২০ বছরের মধ্যে শেরপুরে এত কম খাদ্যশস্য মজুদ কখনো হয়নি। জানা যায়, জেলার গুদামগুলোয় ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য মজুদ ছিল যথাক্রমে ১৫ হাজার ৬৬, ১৯ হাজার ২৯১, ২২ হাজার ২১৮ ও ১৫ হাজার ৮৭১ মেট্রিক টন। আর এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মজুদের পরিমাণ মাত্র ৪ হাজার ১২৩ মেট্রিক টন।

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য কম থাকায় এ বছর চাতাল ব্যবসায়ী ও কৃষক বোরো-আমন চাল-ধান সরকারকে সরবরাহ করেনি। সরকারি সংগ্রহ অভিযান সফল না হওয়ার কারণেই এ বছর শেরপুরে খাদ্য মজুদ নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। তবে শেরপুরে এ পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদকে নাজুক না বলে একটু অস্বাভাবিক বলেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহবুবুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যেসব নিবন্ধিত চাতাল সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করেনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার খাদ্যশস্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমদানিকৃত চাল বাজারে এলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। ’
আলু খাওয়ার পরামর্শ : চালের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এবং ভাতের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প হিসেবে আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের অর্গানিয়ার ডা. আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘চাল ও আলুর পুষ্টিমাণ প্রায় অভিন্ন। বর্তমানে কেজিপ্রতি আলুর মূল্য চালের অর্ধেকের চেয়েও কম। ভাতের বিকল্প হিসেবে আলু খেলে চাল নিয়ে এমন নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হবে না। ’ উত্তরার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাদিয়া পারভীন বলেন, ‘খরচ কমাতে আমরা ভাতের পাশাপাশি নিয়মিত আলু খাচ্ছি। ’

Share

আরও খবর