৩ মার্চ, অনলাইন ডেস্কঃ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের হিসাব-নিকাশ চলছে। নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকিতে আছে বিএনপিসহ প্রায় দুই ডজন দল। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি ও জোটে শরিকদের নিবন্ধন বাতিল নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, পর পর দুটি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিলের (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ৯০ অনুচ্ছেদের ১ ধারার ই উপধারা) বিধান রয়েছে। এদিকে নবম ও দশম সংসদের সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিয়েও নিবন্ধন টিকেছে একটি দলের। এ অবস্থায় বিএনপির মতো অন্তত দুই ডজন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাঁচাতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।

ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার পর দুটি সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল। সামনে একাদশ সংসদ নির্বাচন রয়েছে। এরই মধ্যে নিবন্ধন বাতিলের হিসাব-নিকাশও শুরু হয়ে গেছে। তাই সব দলকে আগামী ভোটে চায় নবগঠিত কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ‘প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের লোক’ আখ্যা দিয়ে যদিও বর্তমান কমিশন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, দশম সংসদ নির্বাচনে ১২টি দল অংশ নেওয়ার পর নিবন্ধন হুমকিতে ছিল বাকি ২৫টি দল। দশম সংসদে অংশ নেওয়া এক ডজন দল একাদশে অংশ না নিলেও নিবন্ধন ঝুঁকিতে থাকছে না। সংসদ নির্বাচনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নবম সংসদে জামায়াতে ইসলামী ও ফ্রিডম পার্টি অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। ২০০৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করেছে ইসি। ২০১৩ সালের আগস্টে আদালতের আদেশে নিবন্ধন অবৈধ হয়েছে জামায়াতের। ২০০৮ সালে ড. এ টি এম শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সময় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নিবন্ধন প্রথা চালুর পাশাপাশি কিছু শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন বাতিলের সুযোগও রাখা হয়। পরে ২০০৯ সালে সংসদে এর আইনি সংশোধন আনা হয়। ২০০৮ সালে দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য ছয় মাসের শর্ত সাপেক্ষে (২০০৯ সালের জুলাই) ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয় নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ৩৮টি দল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদের ভোটে অংশ নিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটে অংশ নেয় ১২টি রাজনৈতিক দল। নিবন্ধন নিয়ে দুটি সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই একাদশ নির্বাচন ঘিরে নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও সক্রিয় হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী পর পর দুবার সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিল হবে। সংসদের সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে পরবর্তী সময়ে যে কোনো উপনির্বাচনে অংশ নিলেও দলগুলোর নিবন্ধন বাঁচতে পারে বলে জানান তিনি।

ঝুঁকিতে যেসব দল : বিএনপি, লিবারেল ডেমক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি।

দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১২টি দল : আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও গণতন্ত্রী পার্টি।

নবম সংসদে ছিল আরও ২৭টি দল : এ নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশ নিয়েছিল। দশম সংসদের ১১টিসহ (বিএনএফ ছাড়া) আরও ২৭টি দল ভোটে ছিল। অন্য দলগুলো হচ্ছে— বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ফ্রিডম পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি।

নতুন তিনটি দল : বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দল তিনটি নিবন্ধন নেওয়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের নিয়ে হিসাব-নিকাশ নেই। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৪০টি নিবন্ধিত দল রয়েছে।

নিবন্ধন বাঁচিয়েছে খেলাফত মজলিস : ইসির কাছে নিবন্ধিত দলগুলোর ভোটে অংশ নেওয়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নবম সংসদের আগে ৩৯টি দল নিবন্ধিত হলেও ২৯ ডিসেম্বরের ভোটে অংশ নেয়নি খেলাফত মজলিস। ২০০৮ সালের ২২ নভেম্বর ৩৮ নম্বর দল হিসেবে দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নিবন্ধিত হয় দলটি। দলের এক নেতা বলেন, ‘নবম ও দশম সংসদের সাধারণ নির্বাচনে আমরা অংশ নিইনি। এ কারণে দলের নিবন্ধন কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে আমাদের কাছে ইসি চিঠি দিয়েছিল। আমরা এর জবাব দিয়েছি। ’

দলটির জবাবে কমিশন সন্তুষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিলেও তাদের নিবন্ধন বহাল রয়েছে বলে কমিশন অবগত করেছে। এ বিষয়ে ইসির সহকারী সচিব রৌশন আরা বেগম জানান, দুটি সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার তথ্য থাকায় দলটির কাছে জানতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে রংপুর-৩ ও ২০১১ সালে হবিগঞ্জ-১ উপনির্বাচনে দলটি প্রার্থী দিয়েছিল বলে জানানো হয়। তা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের নিবন্ধন বাতিল হচ্ছে না। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেই নিবন্ধন বাতিলের প্রসঙ্গ দলটির বিষয়ে সক্রিয় হবে বলে জানান এ ইসি কর্মকর্তা।

চার দলের ঝুঁকি কেটেছে : বিএনপি ও তার শরিক জোটের অনেকে এবং আরও কিছু দল একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিল হবে। দশম সংসদের সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিলেও পরবর্তী সময়ে মৌলভীবাজার-৩ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাগুরা-১ ও টাঙ্গাইল-৪ উপনির্বাচনে এনপিপি, ময়মনসিংহ-৩ উপনির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ ন্যাপ অংশ নিয়েছে।

ইসি সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘সামনে একাদশ সংসদ নির্বাচন রয়েছে। নির্ধারিত সময়েই নতুন নিবন্ধনে আগ্রহীদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। শর্ত পূরণ করলেই নিবন্ধন পাবে দলগুলো। নতুন নিবন্ধনের বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত পেলেই যথাসময়ে আবেদনের জন্য জানানো হবে। আর নিবন্ধন বাতিল হওয়ার মতো এখন কোনো দল আমাদের কাছে নেই। একটি দলের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছিল। তবে দলটি উপনির্বাচনে যাওয়ায় নিবন্ধন বাতিল হয়নি। ’ একাদশ সংসদ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে নতুন ইসি সবাইকে আশ্বস্ত করছে। এ অবস্থায় নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে নতুন করে কথা বলে কোনো ধরনের সমলোচনায় জড়াতেও চাইছে না তারা। সচিব বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন আরও অনেক দূর। সামনে উপনির্বাচন রয়েছে। তাতেও অনেকে অংশ নিতে পারবে। সংসদ নির্বাচন পার না হওয়ার আগে আগাম কিছু বলা ঠিক নয়। যা হবে তা আইনেই রয়েছে, আইনানুগভাবে কমিশন কাজ করবে।

Share

আরও খবর