মোঃ রমজানদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উপর এর আগেও দুটো লিখেছি। এবার আরেকটি প্রসঙ্গ নিয়ে লিখলাম। আসলে জাতির মেরুদণ্ড গঠনে যে শিক্ষা প্রয়োজন সেই শিক্ষার মেরুদণ্ড ঠিক আছে কিনা তা অবশ্যই জানা প্রয়োজন। আলোচনার বিষয় “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।” প্রধানত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রধান আলোচনার বিষয়। মূল কথায় আসি।

আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যানুযায়ী নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকার শিক্ষা নামক মৌলিক এ চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আদৌ গড়ে দিতে পারেনি। যা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে মেধার অবমূল্যায়নে নেই মানসম্মত শিক্ষক। সরকার কর্তৃক পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এর সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তাগণ। গড়ে তুলছে শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় অনেক অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জনসংখ্যার আধিক্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও এখন এমন অবস্থা যে মনে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশিই বেড়ে গেছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তখন যখন দেখি বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী যোগাড়ের জন্য কর্তৃপক্ষগণ আপনার ঘরের দরজায় এসে হাজির হয়। যেন দেশে শিক্ষার্থীর বড়ই অভাব। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই কোন না কোন স্বতন্ত্র নাম নিয়ে গঠিত হয়। বাহবা জানাতে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে। নাম শুনে মনে হয় যেন পাশ্চাত্যের কোন বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। নামের আগাগোড়ায় ব্যবহার হয় নানান আকর্ষণীয় শব্দ। যার অর্থ কিংবা মাহাত্ম্য কিংবা সেই নাম অনুযায়ী তা রক্ষার্থে করণীয় কি উদ্যোক্তাগণ নিজেরাই তা ভালভাবে জানেন না। দারুণ দারুণ সব ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। উচ্চারণ করতে গিয়ে যেন মুখের দাঁতগুলোতে ভূমিকম্পের কম্পন ধরে যায়।

কোন নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে বলবনা। যেমন “…… মডেল স্কুল”,  ”……(বিবিধ) মাল্টিমিডিয়া স্কুল”,  ”…… স্কুল এন্ড কলেজ”,  ”….. প্রিক্যাডেট স্কুল”,  ”…… হলিক্রস”,  ”….. লার্নিং একাডেমী”,  ”…… ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এন্ড কলেজ”,  ”….. ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ”। বিশেষ হাসি পায় দেশের ইংলিশ মিডিয়াম এবং ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে। দেশের এখন বহুল আকর্ষণীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ দুটো নামের প্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল নামের মাধ্যমেই যেন সেরা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এর শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ভাল তা প্রকাশের প্রচেষ্টা। নামের মাধ্যমে গুণ প্রকাশে মরিয়া। আসলেই গুন আছে কি?

ইন্টারন্যাশনাল নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শুনলেই মনে হয় যেন ঝাঁপিয়ে পড়ি। না জানি কি ভাল স্কুল বা কলেজ। যে কর্তৃপক্ষগণ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেন নিশ্চই জানেন এর অর্থ হল “আন্তর্জাতিক”। কিন্তু ঠিক কি করলে যে আপনার প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে তা কি আপনি জানেন?? না জানেননা। জানলেও তা করেননা। আপনার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বা কলেজটিতে কি আছে ইন্টারন্যাশনাল?? ইন্টারন্যাশনাল মানের পাঠ্যসূচি? ইন্টারন্যাশনাল মানের শিক্ষক-শিক্ষিকা? শিক্ষাব্যবস্থা? না কিছুই নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। ভেবে দেখুন। এমনকি আপনার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠানটিতে ‘O’ level, ‘A’ level এর পরীক্ষার পর্যন্ত ব্যবস্থা নেই। তাহলে কেন ইন্টারন্যাশনাল শব্দটির ব্যবহার? লোক দেখানো নয় কি?

দেশে অনেকগুলো নামধারী ক্যাডেট স্কুল রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে ক্যাডেট স্কুল রয়েছে ১২টি যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং তাদের শিক্ষাকার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসনীয় যার দ্বারে কাছে অন্যান্য ক্যাডেট নামধারী স্কুলগুলো নেই। কয়জন ক্যাডেট করা শিক্ষক আছে এসব নামধারী ক্যাডেট স্কুলগুলোতে?? তাহলে কেন ক্যাডেট নামটির ব্যবহার?

প্রিক্যাডেট স্কুলগুলোকে বলছি। যদি ক্যাডেটের পূর্বপ্রস্তুতির নিমিত্তে আপনার প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয় তাহলে আপনার প্রতিষ্ঠানে পড়ার পর তাদের কোচিং সেন্টারগুলোতে মাথা ঠুকতে হয় কেন?

এবার আসুন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর দিকে। বড়ই হাস্যকর এ সেক্টরটি। অযথাই কেবল অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে মোটা টাকা ইনকামের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো খুলে বসেন। আসলে ভেতরে কিচ্ছু নাই। প্রথম শ্রেণীতে পড়া একটি বাচ্চাকে পড়তে দেয়া হয় ১৪টি বই। শুধু ভাবুন একবার। দম বন্ধ হয়ে আসবে। এতগুলো বই পড়ানোর তাদেরইতো সময় নেই। পড়ায়ও না। পড়াতে পারলে তো পড়াবে!! শুধু টাকা আদায়ের জন্য এসব ব্যবস্থা। উপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট। আরে ভাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর শিক্ষকগুলোই তো ভাল করে ইংরেজি পড়তে জানেনা! আর পড়াবে কি?? এরচেয়ে হাস্যকর আর দুঃখের ব্যাপার কি হতে পারে? দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে এসব স্কুল। কেবলমাত্র ব্যাপক প্রচার, আধুনিকতা ও নামের দৌরাত্ম্যেই দর্পের সাথে চলছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি অভিভাবকদের মগজ চিবিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ধরে রাখার জন্য এইসব প্রতিষ্ঠানে ১ম সাময়িক পরীক্ষায়ও ঢোল পিটিয়ে লোক দেখানো পুরষ্কার বিতরণী ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষরা। ভাই সুষ্ঠু পরিবেশ, আধুনিকতা ও বিনোদন শিক্ষায় দরকার আছে বৈকি। তবে যথাযথ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে কোথায়?? আগে ঘর ঠিক করুন তবে পর। মেধা গড়ার কারখানা নাকি মেধা ধ্বংসের কারখানা এটি??

দেশে কিন্ডারগার্টেন ব্যবসায়ও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেই ভাল শিক্ষাব্যবস্থা। শহরে বন্দরে কিংবা গ্রামে-গঞ্জে ছোট টঙ্গের সমান ক্লাস তৈরী করে দাঁড় করানো হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এইসব প্রতিষ্ঠানে এমনও শিক্ষক রয়েছে যারা ভাগ অঙ্কও করতে জানেনা। শিক্ষার্থী হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে অভিভাবকদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য পরীক্ষার খাতায় লেখা না থাকলেও দেয়া হয় ভাল নম্বর। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এমনও দেখেছি একজন শিক্ষার্থী স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, এক হতে পঞ্চাশ পর্যন্ত লিখতে জানেনা কিন্তু প্রথম শ্রেণী হতে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত তার স্থান ক্লাসে প্রথম। কি বুঝলেন?? শুধুমাত্র সুন্দর নাম,আর লোক দেখানো কার্যক্রমের মাধ্যমে বেশ দর্পে টিকে আছে সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জে.এস.সি. পরীক্ষা চালু করার পর নতুন শিক্ষা ব্যবসায় ক্ষেত্র “জুনিয়র স্কুল”। এ সুযোগে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে জুনিয়র স্কুলে রূপান্তর করা হচ্ছে। কিন্তু সেই আগের শিক্ষকগুলো দিয়ে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষদের হাত এত লম্বা যে স্কৃলের সুনাম বজায় রাখতে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলেও হস্তক্ষেপ করতে পারে।

বেসরকারি কিংবা  এমপি-ভূক্ত স্কুলগুলোতে নূন্যতম ডিগ্রী ছাড়া বিভিন্ন শক্তিশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহায়তায় নিবন্ধন ছাড়া কেবলমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেই পেয়ে যাচ্ছে শিক্ষকতার সুযোগ। পূর্বের করা কিছু ফলাফলের সুনাম, লোক দেখানো পরিবেশ, আর বাহারী নামের কৃতিত্বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাঙ্গা ব্যবসা করে যাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে দেশে বাহারী নামের এমন বেসরকারি উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়েরও অভাব নেই।

খুব সহজেই ফাঁকিবাজি করে মুনাফা করে সফলভাবে ব্যবসায় করা যায় বলে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠছে এমন অারও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেভাবে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর জন্য টানাটানি শুরু হচ্ছে জানি না কবে এমন হয় দুনিয়াতে আপনার সন্তানটি আসার আগেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীরা তাকে ভর্তি করিয়ে নেয়। দেশে এত ইংলিশ মিডিয়াম, ক্যাডেট, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল,কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকতেও নেই ভাল মেধা। শুধুই বাহারী নামের ফাঁকিবাজির পাহাড়। তাই বলতে হয় “কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন” মানে গুণ নাই তবু গুণের ভান ধরা। আঞ্চলিক ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে “নামে আছে কামে নাই।”

এভাবে চলতে থাকলে এ জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে এগোবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ করে অভিভাবকদের নিজের সন্তানের সুষ্ঠু লেখাপড়া নিশ্চিত করতে নিজেরাই আরও সচেতন ও যত্নবান হওয়া উচিত।

মোঃ রমজান।
আহ্বায়ক
বাংলাদেশ কবি পরিষদ কুমিল্লা শাখা।
বি.বি.এ.(অনার্স) ২য় বর্ষ,ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ,কুমিল্লা।
২৭-১০-২০১৫

মেধার মূল্যায়ন কোথায়- পর্ব ১

মেধার মূল্যায়ন কোথায়- শেষ পর্ব

Share

আরও খবর