২৮ ডিসেম্বর, নিজস্ব প্রতিবেদনঃ একাত্তরে দেশের মানুষের মধ্যে যে ঐক্য এবং সাহস দেখা গিয়েছিল তা আগে বা পরে আর কখনো দেখা যায়নি। স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে পুরো জাতি এক মতাদর্শে, মুক্তির চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করা গেলেই জাতির মধ্যে ঐক্য নিশ্চিত করা এবং অপরাজনীতি, অপসংস্কৃতি রোধ করা সম্ভব হবে। এমন পরিকল্পনা থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে হাতে নেওয়া হচ্ছে একটি প্রকল্প, উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কর্মসূচি বাস্তবায়নের। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত চলমান কর্মসূচিগুলোতেও বিষয়টি সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রতকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা এবং প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই চলছে। প্রক্রিয়া শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল প্রকল্পটি অনুমোদন দিতে পারেন বলেও জানা গেছে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় প্রস্তাব করায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করার প্রয়োজন হবে না। অনুমোদনের পর বৈঠককে অবহিত করলেই হবে।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রচার, প্রকাশনা এবং সেমিনার ও সমাবেশ আয়োজন মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার। এছাড়া বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে উদযাপিত বিজয় উৎসবেও বিষয়টির প্রতি জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুন থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত। অনুমোদনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে পুরনোদের মাঝে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তরুণ সমাজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা সঠিক ইতিহাস ভালোবাসে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের মধ্যে আছে। সরকার পরিকল্পনা করেছে, এসব উজ্জীবিত তরুণদের মধ্যে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতে। যাতে তারা পথভ্রষ্ট না হয়।

মন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের দেশে অতীতে অসংখ্যবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা হয়েছে। জাতিকে, তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা হয়েছে। এজন্য বর্তমান প্রজন্মের সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে বলে আমরা মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মের এই জাগ্রত শক্তিকে উজ্জীবিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।

এদিকে, আগামী এক বছরের জন্য (১ জুলাই ২০১৭ থেকে ৩০ জুন ২০১৮) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মধ্যে সম্পাদিত বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতেও বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিতে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রভাব উপস্থাপন অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে ১০ হাজার ৩৮৪ শিক্ষার্থীকে অর্ন্তভুক্ত করা গেছে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অর্ন্তভুক্ত করা গেছে ১০ হাজার ৬২২ শিক্ষার্থীকে।

আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫০ শিক্ষার্থীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও আদর্শে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মন্ত্রণালয়। ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই সংখ্যা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে যথাক্রমে ১২ হাজার ৭০ এবং ১২ হাজার ৫৬৫।

এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা), জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার জাগরণ এবং দেশাত্মবোধ শক্তিশালীকরণের জন্য আলাদা কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। এক্ষেত্রে তিনটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে। কর্মসূচি তিনটি হচ্ছে- নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ও ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর প্রদর্শন করা, নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তির উৎসবের আয়োজন এবং জেলা ও বিভাগীয় শিক্ষক সম্মেলন আয়োজন করা।

এর মধ্যে ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মুক্তির উৎসবে যথাক্রমে সাড়ে ১১ হাজার এবং ১২ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া যথাক্রমে ৩৯০ এবং ৩৯৫ শিক্ষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এ সংক্রান্ত শিক্ষক সম্মেলনে।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ঘটনাবহুল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আজকের তরুণদের বেশিরভাগেরই অজানা। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও আমরা আমাদের উত্তরসূরিদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পরিপূর্ণরূপে জানাতে পারিনি। এটি আমাদের অনেক বড় ব্যর্থতা।

তিনি আরো বলেন, এরপরও আজকের তরুণ সমাজের সবাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার। তারা একবাক্যে যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। সব মা-বাবার উচিত তাদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা। তাহলে একদিকে আমরা যেমন দায়মুক্ত হব, অন্যদিকে সে চেতনাবোধ তরুণ প্রজন্মের মাঝে সুদৃঢ় দেশপ্রেমের ভিত্তি স্থাপন করবে।

Share

আরও খবর