তারেক মাসুদ১৩ আগস্ট, বিনোদন ডেস্কঃ ১৩ আগস্ট, ২০১১ সাল, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিশেষ করে বিকল্প ধারার আকাশে অসীম আয়ুর শোকের দিন। সেদিন হারিয়েছিলাম বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের পুরোধা ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদকে। পুরো নাম আবু তারেক মাসুদ। তাকে সবাই তারেক মাসুদ নামেই চেনে। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফেরিওয়ালা তিনি। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের সেই প্রবাদ পুরুষের আজ পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। বিনম্র শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

তারেক মাসুদ ছিলেন একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও গীতিকার। ১৯৫৭ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ। ভাঙ্গা ঈদগাঁ মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন । পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটর ডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স করেন।

তারেক মাসুদ নির্মাতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন ১৯৮২ সালের শেষ দিকে। জীবনে প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন ঐ বছর। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ওই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের উপর নির্মিত হয়। এর আগে অবশ্য ১৯৮৭ সালে সোনার বেড়ি নামে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের ওপর তিনি ২৫ মিনিট স্থায়ীত্বের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সে হিসেবে সোনার বেড়ি তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত কাজ। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র, এনিমেশন, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না মুক্তি পায়। মাটির ময়নার জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর ফোর্টনাইট সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। এ ছাড়া এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে, সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল। তার সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে মুক্তি পায় ২০১০ সালে। তারেক মাসুদের উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯)। আর ১৯৯৫ সালে স্ত্রী ক্যাথরিনে সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র মুক্তির গান।

তারেক মাসুদ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নেন তিনি। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অডিনেটর হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন।

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন। এই দম্পতির ‘বিংহাম পুত্রা মাসুদ নিশাদ’ নামে এক পুত্রসন্তান রয়েছে।

তারেক মাসুদ দেশের চলচ্চিত্রের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কারণ দেশের মূলধারার বাণিজ্যিক ও বিনোদনধর্মী সিনেমা তৈরির বলয় থেকে বাইরে এসে চিন্তাশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তিনি সচেতনভাবে এই কাজটি করেছেন। যে কয়জন চলচ্চিত্রের জন্য নতুন একটি ধারা তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন, তারেক মাসুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। চলচ্চিত্রকে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করতে চেয়েছিলেন তারেক মাসুদ। প্রায়ই দেখা যায়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকে ইরান বা কোরিয়ান চলচ্চিত্রের কথা বলেন। তাও আবার ইরান ও কোরিয়ান বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের কথা। ইরানি কোরিয়ান চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে। তারেক মাসুদসহ কয়েকজন চেয়েছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রও তেমন শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াক। কিন্তু তারেক মাসুদ তার কাজ শেষ করে যেতে পারেননি।

তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি নির্মাতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। তারেক মাসুদকে দেখেই তরুণরা স্বাধীন নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তরুণদে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে নির্মাতা হওয়ার। বর্তমান সময়ে যে কয়জন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন তারা কোনো না কোনোভাবে তারেক মাসুদের কাছে ঋণী। তারেক মাসুদ নিজের নির্মিত চলচ্চিত্র প্রজেকশনের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন। কথা বলেছেন দর্শকদের সঙ্গে। চলচ্চিত্র প্রদর্শন করিয়ে দর্শকদের ভাবতে প্ররোচণা দিতেন।

অপঘাত শব্দটা বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। এর আগে বাংলা চলচ্চিত্রের গতানুগতিক বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র থেকে বাইরে এসে যিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি আলমগীর কবির। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে তিনিও একটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। আর কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের ইতিহাস তো সবারই জানা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মাধ্যম আজ হয়তো অনেক শক্তিশালী মাধ্যম এবং ইন্ডাস্ট্রি অর্থে আমরা যা বুঝি তা দাঁড়িয়ে যেত। যদি এই মানুষগুলো অকালে না চলে যেতেন। কখনো কখনো মনে হয় অকাল ও অপঘাতের এই মৃত্যুগুলো আমাদের চলচ্চিত্র মাধ্যমকে কয়েক যুগ পিছিয়ে দিয়েছে।

তারেক মাসুদের ‘স্বপ্নের’ চলচ্চিত্র ছিল ‘কাগজের ফুল’। তিনি নিজেই বলতেন এটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। খুব আগ্রহ ছিল তার এই সিনেমার ব্যাপারে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য তিনি তার আকাঙ্ক্ষার সিনেমাটি শেষ করে যেতে পারেননি। যা বাংলাদেশের শৈল্পিক, চিন্তাশীল ও বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র ধারার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

বাংলাদেশের বিকল্প ধারার এই কাণ্ডারি পুরুষ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তার স্বপ্নের কাগজের ফুল সিনেমার শুটিং স্পট নির্বাচন করে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। সেদিন তারেক মাসুদের সঙ্গে তার দির্ঘদিনের সহকর্মী বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্প্রচার কিংবদন্তি, টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরও নিহত হন। এ ছাড়া ইউনিটের আরও তিনজন মারা যায়।

তারেক মাসুদ যে খুব বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গেছেন তা নয়। কিন্তু যে কয়টা নির্মাণ করেছেন সেখানে নিজের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন নির্ভয়ে। দৃষ্টি শক্তিকে নিয়ে গেছেন মানব মনের অতল তলে। দেখাতে চেয়েছেন গভীরের যাতনা, মর্মবেদনা, ক্রন্দন। আর এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করতে চেয়েছেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা। যার জন্য আমরা এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছি। তারেক মাসুদ দর্শককে ভাবার সুযোগ দিয়ে তাদের মনে তৈরি করেছিলেন প্রশ্ন, দ্বিধা, করেছেন আত্মসচেতন। সমাজ বাস্তবতায় নিয়ে গেছেন তাদেরকে যাদুকরের মত। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন জীবনের নির্মম সত্যকে। কিন্তু তারেক মাসুদের মুত্যুতে হঠাৎ থমকে যায় সে কাজ, স্তিমিত হয়ে পড়ে আমাদের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের ভাষা নির্মাণের নড়াচড়া। একটি শিক্ষিত চলচ্চিত্র দর্শক গড়ে ওঠার আগে, নিজের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্র দাঁড়ানোর আগে তারেক মাসুদের বিদায় আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য হৃদয় বিদারক ঘটনা।

২০১২ সালে তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক প্রদান করা হয়। আজকের এই দিনে সেলুলয়েডের মহান কবিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Share

আরও খবর