আমার পূর্বপুরুষের আমলে যখন ব্রিটিশরা নীল চাষে বাধ্য করেছিল আর সেই প্রতিবাদে নীল বিদ্রোহ করে নির্যাতন সহ্য করল তখনও আমি মানুষ ছিলাম। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব নামে যখন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম গর্জে উঠল বন্দুক তখনও আমি মানুষ ছিলাম। আর অত্যাচার নির্মমতার জন্য কিংসফোর্ড যখন মুর্তিমান আতংক তখনও আমি মানুষ ছিলাম। এসেছিলাম দুই কিশোর ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্লা চাকী হয়ে প্রতিবাদ করতে। ১৯০৮ সালের সেই ঘটনায় আমি ও আমরা মানুষ ছিলাম।

১৯০৮ সালের ১১ই আগষ্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আগুনের স্ফুলিঙ্গ প্রমাণ করে তখনও আমি মানুষ ছিলাম। ১৯৩০ সালে ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে ‘মাস্টারদা সূর্যসেন’ এর নেতৃত্বে যে সংগ্রাম হলো তখনও আমি মানুষ ছিলাম। জালিওয়ালানাবাগ হত্যকান্ডের প্রতিবাদে আমার পূর্বপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাইট উপাধি ফিরিয়ে দিয়ে প্রমাণ করলেন আমি ও আমরা মানুষ ছিলাম। কাজী নজরুল ইসলাম একের পর এক বিদ্রোহী কবিতা লিখে ব্রিটিশ জেলখানায় নিজের স্থায়ী ঠিকানা করে নিয়েছিলেন। তখনও আমরা মানুষ ছিলাম। আমাদের সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধ ছিল।

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কার্জন হলে উপস্থিত আমার পূর্বপুরুষগণ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। আমি বুঝতে পারি তখনও আমি মানুুষই ছিলাম। অন্যায় অবিচার আমার মনুষ্যত্বে তখনও আঘাত করত। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিম উদ্দিন যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দিতে চাইল তখন সালাম, রফিক, জাব্বার, বরকতরা মান রেখেছেন। মানুষ ও মানবতাকে ধরে রেখেছেন। ভাষাকে ধরে রেখেছেন জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে। ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আমার পূর্বপুরুষ তৎকালিন ছাত্র সমাজ প্রমাণ করে আমরা মানুষ ছিলাম।

এরপর ১৯৬৬ এর ছয়দফা, ১৯৬৯ এর গণ অদ্ভূত্থান আরও পোক্ত করে দেয় মানুষ হিসেবে আমার আত্ম মর্যাদা, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে যখন অকাতরে মানুষ মারা গেল তখন এই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষই নিজেদেরকে নিজেরা সহায়তা করে প্রমাণ করল আমরা মানুষ। ১৯৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভের পরও যখন আমাদের হাতে ক্ষমতা আসল না। টালবাহানা চলতে থাকল ক্ষমতা না দেবার তখন যে অসহযোগ আন্দোলন হল। সারা দেশ অচল হয়ে গেল। রেইসকোর্স ময়দান থেকে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলা হল। বঙ্গবন্ধুর দরাজ কন্ঠে ভেসে এল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। তখনও আমি ও আমরা মানুষ ছিলাম।

১৯৭১ সালের ভয়াল ২৫ মার্চ রাতে যখন হায়েনার দল পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ বাঙালির উপর। মারা গেল ৩০ লাখ মানুষ। যাদেরকে আমরা শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করি। সাথে সম্ভ্রম দিল ২ লাখ মা-বোন। সেই ২৫ মার্চ থেকেই আমরা জানোয়ার মেরে প্রমাণ করেছি সেদিনও আমরা মানুষ ছিলাম। দীর্ঘ নয়মাস আমার পূর্বপুরুষ যুদ্ধ করে মানুষ হিসেবে বিশ্ব দরবারে আমার জাতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। হায়েনার কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে প্রমাণ করেছিল তখনও আমরা মানুষ ছিলাম।

১৯৯০ সালে যখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হল। ডা. মিলন, নূর হোসেনদের রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র ফিরে এল তখনও আমি মানুষ ছিলাম।

এরপর থেকেই আমার বোধশক্তি ভোঁতা হতে শুরু করে। আজ আর আমার নিজেকে মানুষ মনে হয় না। চারিদিকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা। আমার গায়ে লাগে না। দূর্নীতি ছেয়ে গেল সর্বত্র। আমি বড্ড ক্লান্ত। প্রতিবাদের শক্তি সঞ্চয় করতে পারি না। পরীক্ষা হলে নকল, আইনশৃঙ্খলার অবনতি। নষ্টদের দখলে সমাজ, স্বপ্নহীন জাতি, লক্ষ্যহীন যুবসমাজ, পরাস্ত মানবতা, যুক্তিহীন আবেগ, ভোগান্তির জনজীবন, সবকিছু মিলিয়ে জাতি হিসেবে একে একে সকল গৌরব হারানোর পথে। সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক মুক্তি অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই সময়ে আমি এবং আমরা নির্বাক।

যখনই মূল্যবোধ অবক্ষয় রোধ, মানবতার রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠার কথা ছিল তখনই আমরা স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়েছি। পরিণত হয়েছি ষোল কোটি জনসংখ্যায়। একদিন আমি ও আমার পূর্বপুরুষ মানুষ ছিলাম। এখন আমি ও আমাদের বর্তমান প্রজন্ম সংখ্যায় বড় হয়েছি, হয়েছি জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যা আবার কবে মানুষ হবে- ফিরিয়ে আনবে সামাজিক মূল্যবোধ, গড়ে তুলবে আদর্শ সমাজ সেই-প্রতীক্ষায়।

প্রভাষক মাহফুজুল ইসলাম সাইমুম।
এক্সিকিউটিভ এডিটর
দি টাইমস ইনফো ডট কম
তারিখঃ ২৭-১১-২০১৭।

Share

আরও খবর