১৬ জানুয়ারি, অনলাইন ডেস্কঃ প্রণব মুখার্জি গতকাল ঢাকায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু করেন দিন। গভীর মমতায় স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখার পর বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সাহসী নেতা হিসেবে উল্লেখ করে স্যালুট জানান। দুপুরে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন। প্রশংসা করেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের। পরে বিকালে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে দেশি-বিদেশি কবি, সাহিত্যিক ও সুধীজনদের উদ্দেশে দেন দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য।

জঙ্গিবাদের বিষ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, পরিবেশদূষণের চেয়েও অনেক বড় সমস্যা হলো মানুষের চিন্তার দূষণ। পাঁচ দিনের ব্যক্তিগত সফরে রবিবার ঢাকায় আসা প্রণব মুখার্জি আজ চট্টগ্রাম যাবেন।

জানা যায়, প্রণব মুখার্জি গতকাল সকালে হোটেল সোনারগাঁও থেকে বের হয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সাহসী নেতা হিসেবে উল্লেখ করে স্যালুট জানান তিনি। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের পরিদর্শন বইয়ে প্রণব মুখার্জি লেখেন, ‘ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে পুনরায় ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষকে এই বাড়ি থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব। যাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এখানেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে হত্যা করা হয়।’ তিনি আরও লেখেন, ‘এই বাড়িটিই একটি নতুন জাতির জন্ম ও এগিয়ে চলার ইতিহাসের সাক্ষী। আমি সর্বকালের সাহসী এই নেতাকে স্যালুট জানাই এবং সব শহীদের প্রতি সম্মানজনক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’

মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জিকে নিয়ে প্রণব মুখার্জি গতকাল দুপুর ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে পৌঁছান। শেখ হাসিনা গণভবনের প্রধান প্রবেশমুখে ফুলের তোড়া হাতে প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানান। শর্মিষ্ঠা মুখার্জির সঙ্গে আলিঙ্গন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা গণভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকের আগে দুই নেতা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেন। প্রণব মুখার্জি তার অবসর কাটানোর বৃত্তান্ত তুলে ধরে বলেন, বই পড়েই এখন তার সময় কাটছে। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছি। ভারতের সংসদে এবং রাষ্ট্রপতির পদের মতো সাংবিধানিক পদে ছিলাম। অবসর গ্রহণের পর আমার অফুরন্ত সময় পড়ার জন্য।’ ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে তার প্রথম বিদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন প্রণব মুখার্জি।

বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে আদর্শ : প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে বলেন, তার সরকারের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের ফলে দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের বন্যার ফলে দেশের অর্থনীতি খানিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত নাগরিককে আশ্রয় প্রদান করেছে। পরে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করেন। রাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আয়োজনে সোনারগাঁও হোটেলে নৈশভোজে অংশ নেন প্রণব মুখার্জি।

পরিবেশদূষণের চেয়ে বড় সমস্যা চিন্তার দূষণ : বিকালে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। বক্তৃতায় তিনি বলেন, পরিবেশদূষণের চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মানুষের চিন্তার দূষণ। এখন দূষিত চিন্তার মানুষের হিংস্র আক্রমণে মারা যাচ্ছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। শুধু আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মানুষে মানুষে হিংসা-দ্বন্দ্ব, জাতিগত সংঘাত, সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটছে। এই হিংস্র পৃথিবীতে কীভাবে বাঁচবে মানুষ? তিনি বলেন, ভয়াবহ এই দূষণের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব স্রষ্টাদের। সাহিত্যিক, কবি, লেখকরা নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন।

প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘যখন বিরাট বাড়ি তৈরি হয় তখন আর্কিট্যাক্টকে সহায়তা করেন রাজমিস্ত্রি। তাকে ইট-সিমেন্ট দিয়ে যারা সহায়তা করেন তারা হলেন জোগালি। আমি হলাম বাংলা সাহিত্যের একজন জোগালি মাত্র।’ ভারতের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে নিজের পাঠাভ্যাসের কথা তুলে ধরে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘আমি পড়ুয়া, পড়তে ভালোবাসি। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পড়তে পারিনি। চার দশক সংসদে ছিলাম। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। কাজের ঠেলায় পড়ার সুযোগ পাইনি। রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখলাম, পৃথিবীর কোথাও ৩৩০ কক্ষের এমন রাজপ্রাসাদ নেই। সেখানে আমি কী করব? যখন মন্ত্রী ছিলাম, সংসদে ছিলাম, তখন কাজ করতাম। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তেমন কাজ ছিল না। সরকার তৈরি হয় সাধারণ মানুষের ভোটে। তারা মানুষের জন্য কাজ করেন। রাষ্ট্রপতির কাজ নৈবেদ্যের মণ্ডার মতো বসে থাকা। প্রধানমন্ত্রী ফাইল পাঠাবেন, আইন প্রণয়ন করবেন সাংসদরা, আমি তাদের পরামর্শ দেব। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সেখানে কম। তিনি বছরে একবার সংসদে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন, যার দাঁড়ি, কমা সবটাই মন্ত্রিসভার তৈরি। রাষ্ট্রপতিকে বলতে হবে, মাই গভর্নমেন্ট।’

তিনি বলেন, ‘তবে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে এত বই রয়েছে যে তিনবার রাষ্ট্রপতি হলেও তা পড়ে শেষ করা যাবে না। পড়তে শুরু করলাম। পাঠক হিসেবে এখানে এসে ভালো লাগছে।’ প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ভবনে আধুনিক ভারতবর্ষের প্রচুর কাগজপত্র, অনেক দুষ্প্রাপ্য গোপনীয় রেকর্ড, পড়বার জন্য প্রচুর উপাদান পেয়ে গেলাম।’ ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যকে তারা লুট হয়ে যেতে দেননি। আগ্রাসকদের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেননি। সংস্কৃতিকে তারা রক্ষা করেছেন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বুকের রক্ত ঢেলেছে বাঙালি, তারপর অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বাংলাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে বাঙালিরা। এ দেশে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন হবে না তো কোথায় হবে!’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলা ভাষার রক্ষক। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, যারা আন্দোলন করে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছেন তাদের আমরা শ্রদ্ধা জানাই।’ প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতার ইতিহাস এ কথা বলে গেছে যে হিটলার-মুসোলিনিরা নয়, সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন প্রফেট, ক্রাইস্ট, বুদ্ধা। দিগ্বিজয়ী বীরেরা নয়, সভ্যতার ইতিহাসের দিক নির্মাণ করেছেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক তথা শিল্পীরা।’ লেখক-সাহিত্যিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসুন, এই সংকল্প করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা হিংস্রতার সব বিষবাষ্প থেকে বাঁচাব।’ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকালের শেষ কর্মসূচি হিসেবে রাতে অর্থমন্ত্রীর আয়োজনে এক নৈশভোজে অংশ নেন প্রণব মুখার্জি। আজ তিনি চট্টগ্রাম যাচ্ছেন।

চট্টগ্রামে বীরের স্মৃতি দর্শন করবেন প্রণব : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন ও বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শন করতে আজ চট্টগ্রাম আসছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। চট্টগ্রামে অবস্থানকালে তিনি বিপ্লবীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান পরিদর্শন ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ করবেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। জানা যায়, সকালে বিমানযোগে চট্টগ্রাম আসার পর দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন প্রণব মুখার্জি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুর রব হল মাঠে একটি অনুষ্ঠানে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। সেখানে তাকে ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত করবে বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নামে নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক হল পরিদর্শন করবেন। এরপর তিনি রাউজান কলেজের পাশে উপজেলা সদরে বিপ্লবী সূর্যসেনের আবক্ষ মূর্তি, তোরণ ও বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে দেখবেন। তিনি মাস্টারদার আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবেন। পরে নোয়াপাড়ায় মাস্টারদার বাড়ি পরিদর্শন করবেন প্রণব। পরিদর্শন শেষে তিনি নগরে ফিরে এসে রাতে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন। বুধবার সকালে নগরের পাহাড়তলীতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিবিজড়িত ইউরোপীয় ক্লাব ও ব্রিটিশ অস্ত্রাগার পরিদর্শন করবেন। পরে তিনি ঢাকায় ফিরে যাবেন। প্রণব মুখার্জির চট্টগ্রাম সফর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে পুলিশ। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে নগরের অক্সিজেন সড়ক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট পর্যন্ত প্রায় ৪১টি পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া সার্বিক নিরাপত্তায় অনুষ্ঠানের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পিজিআর, পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ভিভিআইপি নিরাপত্তার সার্বিক বিষয় তদারক করছে এসএসএফ।

Share

আরও খবর