কাঁঠাল না আমঢাকা শহরে বড় কাঁঠাল নয়, ছোট কাঁঠালের দাম বেশি। আমার বাসার সামনের রাস্তায় প্রতিদিন চারচাকার ভ্যাণগাড়িতে নিয়মিত কাঁঠাল বিক্রি হয়। কাঁঠালগুলো অতিক্ষুদ্র এবং অদ্ভূত রকমের বে-আকৃতির ধরণের, আমি বাজি ধরে বলতে পারি, গ্রামের সবচেয়ে হতদরিদ্র মানুষগুলো বিনা পয়সায় পেলেও এই কাঁঠাল তারা খাওয়ার জন্য গ্রহণ করবে না। আর গাছের মালিকেরা নিজেরাতো খাবেই না, আবার নিজের পোষা গরুকেও খাওয়াতেই লজ্জাবোধ করে, তাই গাছের ফল গাছেই সাজিয়ে রাখে, আর সময়মত তা নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে।

আমি বিক্রেতাকে কাঁঠালের এই আকৃতির কারণ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পাই এইভাবে,-ঢাকা শহুরে আম চলে, কাঁঠাল নয়। আর যদিও শখ করে দু’একজন কাঁঠাল কেনে তাও ছোট কাঁঠালই। বেশি ওজনের কারণে টেনে উপরে তোলার ঝামেলা, খাওয়ার লোকের অভাবে কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যাওয়া, ফ্রিজে রাখার জায়গা না থাকা, ফ্রিজ গন্ধ হয়ে যাওয়া, ফ্রিজের অন্য খাবারগুলিতে কাঁঠালের গন্ধ ছড়িয়ে পরা এসব কারনে শেষ পর্যন্ত খেতে না পেরে বাসার বুয়াকে দিয়ে নিজেদের উদ্ধার করে কাঁঠালের হাত থেকে। যেন বাসায় ঢুকিয়ে পাপ কার্য করিয়াছে পরিবারেরর সদস্যদের এমনটাই আচরণ। পাশের ফ্লাটের মানুষেরা কাঁঠালের গন্ধকে গ্রাম্য বা ক্ষেত ভাববে এই ভয়েই আরেক পাশের ফ্ল্যাটের মানুষেরাও কাঁঠাল কেনেন না। আর এইভাবেই শহরের ফ্ল্যাটবাসিদেরই কাঁঠাল কেনাই হয় না।

আমি প্রতিদিনই আমার বাসায় ঢোকার মুখে কাঁঠালগুলোর দাম জিজ্ঞাসা করি আর দাম শুনে মলিনমুখে বাসার সিঁড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে উপরে উঠতে থাকি আর এই বলে নিজেকে শান্ত্বনা দিই, এত উপরে কাঁঠাল হাতে সিঁড়ি ভাঙ্গা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর কাঁঠাল খাবেই বা কে? বাসার সদস্য সংখ্যা মাত্র দু’জন। যার একজন আবার এই ফল মোটেই পছন্দ করে না। তাঁর পছন্দ আম। যা ফ্রিজ ভর্তি করে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে যশোরের গোপালভোগ, রাজশাহীর ল্যাংড়া আর রংপুর থেকে হাড়িভাঙ্গা নামক আম তিনি আনিয়েছেন।

এই প্রজন্ম হচ্ছে শহরের আধুনিক প্রজন্ম, যারা ভাত খায় না ফাস্টফুড খেয়ে বেঁচে থাকে। যারা প্রকৃতির নিঃশ্বাসে বেঁচে থাকে না, টিভি, মোবাইল, ফেসবুকের ভেতর বেঁচে থাকে। আর বাতাসে পোড়া পেট্রোলে ধোঁয়ার গন্ধ না পেলেতো নিঃশ্বাসই বন্ধ হয়ে যায় এদের। সেখানে কাঁঠাল না খাওয়াতো স্বাভাবিক, যদি জাত চলে যায়।

স্বাধীনতার পর “আম” আর “তালে”র সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে “জাতীয় ফলে”র তকমা নিতে হয়েছে এই কাঁঠালকে। কাঁঠাল বিশেষজ্ঞদের যুক্তি,-কাঁঠাল গাছের প্রতিটি অংশই ব্যবহারযোগ্য। কাঁঠাল গাছের পাতা ও বাকল গৃহপালিত পশুদের খাওয়ানো যায়, কিন্তু আম পাতার তেমন কোন ব্যবহার নাই। কাঁঠালের বিচি সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভর্তি। কিন্তু আমের বাকল আর বিচি কেউ খায় না। কাঁঠালের রোয়ার পুষ্টিগুণ অনেক বেশি, দামে সস্তা। আম কাঠের তুলনায় কাঁঠালের কাঠ ভালো। কাঁঠাল চাষও লাভজনক। একটি গাছে আম ও কাঁঠাল ধরার পরিমাণ ও তাদের বিক্রয়মূল্য হিসাব করলে কাঁঠাল এগিয়ে থাকে। সার ও কীট-নাশক ব্যবহার না করলেও চলে, রোগবালাই কম হয়।

অনেক আধুনিক ছেলে মেয়েদেরকে কাঁঠালকে তারা গোখাদ্য হিসাবে জানে। তারা মনে করে, গ্রামের গরীব মানুষের পান্তার সাথে মিশ্রিত ফল এই কাঁঠাল। আবার অনেকে জাত চলে যাওয়ার ভয়ে কাঁঠাল খায় না।

বইতে লেখা আছে, আমাদের দেশের জাতীয় ফল এই কাঁঠাল। যা বিলুপ্ত ঘোষণা করার সময় হয়ে এসেছে। এর স্থলে আধুনিক প্রজন্ম আম’কে জাতীয় ফল হিসাবে দেখতে চায়। শুধু কাঁঠালই নয় পঞ্চাশ বছর আগের জাতীয় ফুল,পাখি,পশু সব কিছুরই বিলুপ্তি ঘোষণা করে শাপলা ফুলের বদলে গোলাপকে নতুন জাতীয় ফুল, দোয়েল পাখির স্থলে কাককে জাতীয় পাখি, রয়েল বেঙ্গলের বদলে কুকুরকে অথবা গরু’কে জাতীয় পশু হিসাবে দেখতে চায়। সেই সাথে তাদের অন্যতম প্রধান চাওয়া- জাতীয় খেলা কাবাডির স্থলে
ক্রিকেটকে জাতীয় খেলা হিসাবে এই মুহুর্তে দেখতে পাওয়া। তাদের ভাষায়, এই খেলা আমরা দেখিওনা, বুঝিও না, শিখিওনি, শিখতে চাইওনা!

এই প্রজন্ম আর আগের প্রজন্মের স্বাদ আর চিন্তা-ভাবনার ঢের অমিল স্বত্বেও কাঁঠাল, দোয়েল,শাপলা, রয়েল-বেঙ্গলরা টিকে আছে। সেই সাথে কাবাডি ও টিকে আছে, তবে কত্বদিন ধরে রাখা যাবে এদের তা সময়-ই বলে দেবে। তবে এটা নিশ্চিত আমাদের প্রজন্ম শেষ হওয়া মাত্রই এদেরকে আর রক্ষা করা সম্ভবপর না ও হতে পারে।

আলমগীর খায়ের।
০১-০৭-২০১৬।

Share

আরও খবর