জন্ডিসজন্ডিস আসলে কোন অসুখের নাম না, বরং এটি কতগুলো বিশেষ অসুখের লক্ষণ মাত্র। যে কোন কারণেই রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে জন্ডিস বলা হয়। জন্ডিস হলে সাধারণত চোখের সাদা অংশটি হলুদ রং ধারণ করে এবং কখনও কখনও ত্বকের রংও হলুদ হয়ে যেতে পারে।

সাধারণ নিয়মেই রক্তের লোহিত কণিকা চারমাস পরে ভেঙ্গে যায়। তখন সেখান থেকে যে হিমোগ্লোবিন বেরিয়ে আসে তা বিলিরুবিনে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের মাধ্যমে লিভারে চলে আসে এবং সেখান থেকে পিত্তরসের সাথে মিশে অন্ত্রে যায় ও সবশেষে মল দিয়ে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। বিলিরুবিনের রং হলুদ বলে রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে গেলে দেহের বিভিন্ন অংশের রং হলুদ হয়ে যায়।

মূলত তিনটি কারণে জন্ডিস হতে পারে। এক: রক্তের হিমোগ্লোবিন বেশি বেশি ভেঙ্গে গিয়ে বিলিরুবিন বশি তৈরি হলে; দুই: লিভার অসুস্থ হয়ে বিলিরুবিনকে পিত্তরসের সাথে বের করে দিতে না পারলে; এবং তিন: কোন কারণে পিত্তনালী বন্ধ হয়ে বিলিরুবিন অন্ত্রে পৌঁছাতে না পারলে।

একটি লোহিত কণিকার গড় বয়স চারমাস। কিছু কিছু অসুখ আছে যেখানে লোহিত কণিকা স্বাভাবিক সময়ের আগেই ভেঙ্গে গিয়ে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যেমন থ্যালাসীমিয়া, সিকল সেল এনিমিয়া সহ আর কিছু জন্মগত রক্তের অসুখ। এছাড়া ম্যালেরিয়া রোগেও বিপুল পরিমাণ লোহিত কণিকা ভেঙ্গে গিয়ে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। এসব অসুখে সাধারণত লিভারের কোন সমস্যা থাকে না।

বিভিন্ন হেপাটাইটিস ভাইরাস সহ অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ, অতিরিক্ত মদপান, ওষুধের বিষক্রিয়া, লিভারে চর্বি জমা ইত্যাদি কারণে যখন লিভারে প্রদাহের সৃষ্টি হয় তখন সেই অসুস্থ লিভার রক্তের স্বাভাবিক পরিমাণ বিলিরুবিনও পিত্তরসের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করতে পারে না বলে তা রক্তে জমতে থাকে এবং জন্ডিস দেখা দেয়।

বিলিরুবিন লিভার থেকে পিত্তরসের সাথে বেরিয়ে যদি পিত্তনালী বন্ধ থাকার কারণে অন্ত্রে পৌঁছাতে না পারে তাহলেও জন্ডিস দেখা দেবে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার অথবা পিত্তনালীতে পাথর বা ক্যান্সারের কারণে এটি ঘটতে পারে। এধরণের জন্ডিসের চিকিৎসায় সাধারণত অস্ত্রোপচার বা অন্য বিশেষ কোন পদ্ধতির চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

আমাদের দেশে পানিবাহিত হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস দ্বারা আক্রমনের ফলে যে ধরনের জন্ডিস হয় তার প্রকোপই বেশি। এর জন্য তেমন কোন চিকিৎসারও প্রয়োজন হয়না কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজে থেকেই এ অসুখগুলো ভাল হয়ে যায়। কিছু অসাধু ব্যক্তি এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে স্বপ্নে পাওয়া বা জন্মসূত্রে পাওয়া চিকিৎসার নাম করে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে থাকে। তবে রক্ত ও যৌনবাহিত হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত লিভারের সমস্যাকে অত্যন্ত বিপদজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় পঞ্চাশ কোটিরও বেশি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এদের মধ্যে অনেকের লিভারে এ জীবাণু চিরকালের জন্য অবস্থান নেয় এবং লিভার কোষে প্রদাহের সৃষ্টি করে, এ অবস্থাকে ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে যা থেকে কারও কারও লিভারে ক্যান্সার অথবা সিরোসিস হতে পারে। সংখ্যার দিক থেকে সি ভাইরাস এর প্রকোপ কম হলেও এটিকে বি ভাইরাস থেকেও মারাত্মক বিবেচনা করা হয় একারণে যে তুলনামুলকভাবে সি ভাইরাস থেকেই ক্রনিক হেপাটাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ সি ভাইরাসের আক্রমণে মারা যায়। বি ভাইরাসের জন্য ভ্যাকসিন থাকলেও এখনও সি ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে জন্ডিস অনেক কারণেই হতে পারে, এবং এগুলোর জন্য চিকিৎসার ব্যাবস্থাও ভিন্ন ভিন্ন। জন্ডিসের সাথে জড়িত অন্যান্য উপসর্গ থেকে চিকিৎসক জন্ডিসের কারণ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারনা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুসারে রক্তের কিছু সাধারণ পরীক্ষা, লিভার ফাংশন টেস্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাফি সি টি স্ক্যান , বায়োপসি, ই আর সি পি ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। কিছু কিছু জন্ডিস যেমন আপনাআপনি ভাল হয়ে যায়, তেমনি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে কিছু কিছু জন্ডিস মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তাই জন্ডিস হয়েছে সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোগটির কারণ নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন।

ডঃ এন কে নাতাশা।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ হেল্‌থ সায়েন্স।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
তারিখঃ ০৭/০৫/২০১৬

Share

আরও খবর