জনসংখ্যা১১ জুলাই, নিজস্ব প্রতিবেদনঃ চারদিকে মানুষ আর মানুষ। দেশে প্রতি মিনিটে জন্ম নিচ্ছে গড়ে আটটি শিশু। এ তথ্য, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের। সম্পদের তুলনায় ক্রমবর্ধমান এ জন্মহার দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেয়েও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা।

সর্বশেষ আদম শুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ বাড়ছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৭২ লাখ। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজার ১৫ জন মানুষ বাস করে। এ মুহূর্তে ১ দশমিক ৩৭ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে দেশের সীমিত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, জলবায়ু, পরিবেশ, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা কষ্টসাধ্য হবে।

দেশের প্রধান জাতীয় সমস্যা জনসংখ্যা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোন অর্জনই কাজে আসবে না।‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়’ এই স্লোগানকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করার কথা সরকার ও পরিবার পরিকল্পণা অধিদফতরের তরফে বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই।

খোদ সরকারও আশংকা করছে জনসংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে কৃষি জমি কমে যাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও খাদ্যের জোগান কমে যাবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশে বড় ধরণের চাপ তৈরি হবে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহেদ মালেক বলেন, জনসংখ্যার চাপে ভূমি কমবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান করা কষ্টকর হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দাবি, বাংলাদেশ সফলভাবে মোট প্রজনন হার কমিয়েছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণপদ্ধতির হার বেড়েছে। দেশে শিশুমৃত্যু কমেছে। এসব সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জনসংখ্যা খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবার ও পরিকল্পনা সমিতি (এফপিএবি)র মহাসচিব নাসির আহমেদ বলেন, ‘দেশের প্রধান জাতীয় সমস্যা জনসংখ্যা। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আমাদের কোন অর্জনই কাজে আসবে না।’ তিনি চীনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘চীন এক সন্তাননীতি গ্রহণ করে এখন বিশ্বের এক নম্বর দেশ হতে যাচ্ছে। আর আমরা অনেক পিছিয়ে।’

জনসংখ্যা বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জনসংখ্যা বাড়ার যেসব কারণ আগে ছিল, এখন ঠিক একই কারণে বাড়ছে। জনসংখ্যার আকার বেড়ে যাওয়ায় সব ক্ষেত্রে সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর গতিরোধ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে সরকার ব্যর্থ হলে দেশটা বসবাস ও শাসনের অযোগ্য হয়ে যাবে।’ তার মতে, ‘জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কোন সরকারই ভাবেনি। একটা সময় হয়ত শুধু নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি মুখ্য ছিল। এখন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাও জরুরি। নয়তো জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার ব্যাপারটা স্লোগানের মধ্যে আটকে থাকবে।’

জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার সামর্থ্য নেই :
নিত্যদিনের জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের বাজারে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার সামর্থ্যও নেই অনেকের। বর্তমানে দেশে ৫৪ ভাগ পুরুষ ও মহিলা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। এরমধ্যে মাত্র ৬ ভাগ পুরুষ। এছাড়া সরকারি হিসাবে ১৯ ভাগ আগ্রহী মানুষের কাছে জন্মনিরোধক সামগ্রী এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আবার ইচ্ছা থাকলে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম বেড়ে সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সূত্রমতে, দেশে বিবাহিত নারীদের ৫৬ ভাগ পরিবার পরিকল্পণা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে ৪৭ ভাগ আধুনিক এবং ৯ ভাগ সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। চাহিদা থাকার পরও দেশের ১৮ ভাগ নারী পরিবার পরিকল্পণার কোন পদ্ধতিই হাতের কাছে পান না।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পণা কার্যক্রম শুরু হয় স্বাধীনতার পূর্ব থেকে। প্রথমে বেসরকারি পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) পরিবার পরিকল্পণায় অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল। বস্তুতঃ এক সময়ে অর্থাৎ এক পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বেশ জোরালোভাবে শুরু হয়েছিল। ধর্মীয় গোঁড়ামী এক্ষেত্রে বাধা হলেও এই কার্যক্রমে খুব বেশি বাধা হয়ে দেখা দেয়নি। তখন বেশ সফলতাও পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে দেশের শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বেড়েছে। সচেতন দম্পতির সংখ্যাও বেড়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রচার লক্ষ্য করা যায়। তবু পরিবার পরিকল্পণা কার্যক্রমের তেমন সচল কার্যক্রম চোখে পড়ে না। মাঠ পর্যায়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে তেমন সচেতনতা নেই বললেই চলে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছেড়ে দেওয়ার হার যেমন বেশি তেমনি সক্ষম দম্পতির সংখ্যা বেশি। ২৭ শতাংশের বেশি দম্পতির পরিকল্পণার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেই সেবা দেওয়া হচ্ছে না তাদের। মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে।

রাজধানীর জুরাইন রেললাইন বস্তির বাসিন্দা একাব্বর হোসেন বিয়ে করেন দশ বছর আগে। তার এখন সাতটি ছেলেমেয়ে। তার পাশের বস্তিঘরের বাসিন্দা রিকশাচালক রিফাত বিয়ের আট বছরের মধ্যে একে একে সাত সন্তানের বাবা হয়েছেন। জন্মনিয়ন্ত্রণের কোন উপকরণ তাদের কাছে পৌঁছে না। সরকারের পরিবার পরিকল্পণা কর্মী তাদের বস্তিঘরে যান না। ঢাকার একটি গার্মেন্টে কর্মরত আবুল কালাম ও নাফিসা বিয়ের চার বছরের মধ্যে তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তারা থাকেন রাজধানীর মাদারটেকে। নিত্যদিনের জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের বাজারে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। রায়েরবাগের বাসিন্দা মালিহা বেগমের স্বামী সেকেন্দার আলী একটি বাসাবাড়িতে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করেন। সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনের মধ্যে ২৫০০ টাকা মাস শেষে চলে যায় বাসাভাড়ায়। বাকি টাকায় খেয়ে না খেয়ে মাস কাটালেও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার সামর্থ্য তাদেরও হয় না।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর সূত্র জানায়, কার্যক্রম পরিচালনায় অধিদফতরের লোকবলের সঙ্কটও তীব্র। মাঠপর্যায়ের মাত্র সাড়ে ২৩ হাজার কর্মীর মাধ্যমে বেশিরভাগ নারীর কাছে পৌঁছছে না প্রজনন স্বাস্থ্যবার্তা।

হাসপাতালে কার্যক্রম স্থবির :
স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা যায়, দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ‘পরিবার পরিকল্পণা মডেল ক্লিনিক’ চালু আছে। এসব ক্লিনিকেও নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছে না। দেশের ৪১৭টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আছে জন্মনিয়ন্ত্রণে বিশেষ কার্যক্রম। উপকরণের অভাবে এর মধ্যে অর্ধেক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। দেশের ৩ হাজার ৭২৫টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর পরিচালিত কার্যক্রম ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সঙ্কট চরম।

Share

আরও খবর