৩ এপ্রিল, অনলাইন ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা। শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকা দুই ডজন চুক্তি ও সমঝোতার। প্রস্তাবনায় থাকা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় যেমন কাটাছেঁড়া চলছে, তেমনি চলছে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি। তালিকা অনুসারে সাজানো হচ্ছে কর্মসূচি। খতিয়ে দেখা হচ্ছে নিরাপত্তাসহ অন্য বিষয়গুলো। রাজনৈতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তারা ঠিক করছেন কোথায় থাকবেন কোন ভিআইপি। প্রস্তুতি চলছে তাদের খাদ্য তালিকা নিয়েও। অবশ্য অন্য সফরের থেকে এবারের সফরের ব্যতিক্রম হচ্ছে—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের সর্বোচ্চ আতিথেয়তা দেওয়ার বিষয়টি।

প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি ভবনে বিদেশি কোনো সরকার প্রধানকে থাকতে দেওয়ার পাশাপাশি সম্মাননার বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের কথাও শোনা যাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে। জানা যায়, চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শেখ হাসিনা ৭ এপ্রিল নয়াদিল্লি যাবেন। পরদিন ৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শীর্ষ বৈঠকের পর স্বাক্ষর হবে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো। ঢাকা-দিল্লি এখন পর্যন্ত ২৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও কর্মকর্তারা।

তবে সূত্রের খবর, যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে, তার তালিকায় আছে ইতিমধ্যেই আলোচনার সৃষ্টি করা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমঝোতা স্মারকটি। অবশ্য এ তালিকায় নেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয় তিস্তা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন পর্যন্ত এই সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো আভাস নেই। শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কিছু না ঘটলে এ সফরে তিস্তা চুক্তি হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। অবশ্য ভারতের পক্ষ থেকে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবার সুস্পষ্ট একটি ঘোষণা আসতে পারে। চুক্তি স্বাক্ষর হবে আরও নানা সহযোগিতা নিয়ে।

কূটনৈতিক সূত্রের খবর, শেখ হাসিনার সফর ঘিরে ঢাকা ও দিল্লির কর্মকর্তাদের ব্যস্ততার পাশাপাশি আলোড়ন চলছে রাজনৈতিক মহলও। রাইসিনা হিলে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে যে নৈশভোজ আয়োজন করতে যাচ্ছেন সেখানে মমতা ব্যানার্জির উপস্থিতি নিয়ে চলছে আলোচনা। নৈশভোজে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণ জানানোর পর থেকেই নানামুখী তত্পরতা শুরু হয়েছে ভারতের রাজনৈতিক মহলে। কারণ বাংলাদেশের প্রধান প্রত্যাশা তিস্তা চুক্তি মমতা ব্যানার্জির কারণেই আটকে আছে বলে বরাবরই দাবি করে আসছে নয়াদিল্লি। এবার প্রণব মুখার্জি ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে মমতা ব্যানার্জি কী বলেন তা নিয়েই সবার আগ্রহ।

বর্তমান সামরিক সহযোগিতাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমঝোতা স্মারকে : ঢাকা ও দিল্লির কর্মকর্তাদের তথ্যানুসারে, গত ডিসেম্বরে ভারতের সদ্য সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে একটি ‘চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা করেন। সেসময় ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি রূপরেখা চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন স্তরে আলোচনার পর বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে একটি স্বল্প মেয়াদের সমঝোতা স্মারক সইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। গত সপ্তাহে ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারক’ শীর্ষক এই সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করেছে দুই দেশের কর্মকর্তারা।

সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে চূড়ান্ত করা এই খসড়া অনুসারে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সহায়তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। সেই সঙ্গে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় আইন, পরস্পর নিজেদের দেশের আইন, শর্তাধীন বিষয়, নীতি ও প্রথার প্রতি সম্মান জানাবে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে উভয়পক্ষ প্রশিক্ষণ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও পর্যবেক্ষক, সামরিক শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও তথ্যবিনিময় করবে। সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সহযোগিতাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে দুপক্ষ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কর্মকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর মধ্যে বৈঠক হবে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে উভয়পক্ষ সমুদ্রগামী জাহাজ ও উড়োজাহাজের সফর বিনিময় আয়োজন করবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় উভয়পক্ষ সমন্বিত টহল কিংবা যৌথ মহড়া পরিচালনা করবে। সামরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ, মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহযোগিতা, কারিগরি সমর্থন, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো যুক্ত আছে খসড়ায়। খসড়া অনুযায়ী বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, গুণগত মান নিশ্চিত এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি ও সংস্থার মাধ্যমে এই সহযোগিতা হবে। দুপক্ষই তাদের সরকারি নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পণ্য উৎপাদন কীভাবে হবে, তা আলোচনা করে ঠিক করবে।

পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখার সমঝোতা স্মারকটি সইয়ের পর থেকে মেয়াদ পূর্তির পরদিন নবায়ন হবে। যদি এটিতে কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে যেকোনো পক্ষ নোটিস দিয়ে তা জানাবে। নিরাপত্তা সহযোগিতাবিষয়ক সামগ্রিক পর্যালোচনার জন্য উভয় দেশের প্রতিরক্ষা সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার পর্যায়ে বার্ষিক সংলাপ নিয়মিত অনুষ্ঠানের কথাও থাকছে এই সমঝোতা স্মারকে।

Share

আরও খবর