সউলএকটা কনফারেন্সের উদ্দেশ্যে সউল যাবার প্ল্যান করা হল প্রায় ২ মাস আগে। ওরা ট্রাভেল গ্রান্ট যা দেবে তাতে প্লেন ভাড়া হয়ে থাকার পয়সা হবে কিন্তু না খেয়ে আর না ঘুরে। তাই খোজ খোঁজ বন্ধু বান্ধবের বাসা, যেখানে ফ্রি তে থাকা খাওয়া পাবো আর ঘুরাঘুরির পয়সা হয়ে যাবে। হল বন্ধু সালিমা-র বন্ধু ( দূর কি দোস্ত!) KIST এ পোস্ট ডক করছে! অসম্ভব আন্তরিক সজ্জন দম্পতি তনুজা-মামুন। টোনাটুনির নীড়ে টুনটুনি আসি আসি করছে। চরম ব্যাস্ততার মাঝেও আপ্যায়ন আর যত্নের ত্রুটি রাখেনি। ওদের সবরকম মঙ্গল কামনা করছি। যাহোক সস্তার প্লেন চায়না ইস্টার্ন। সস্তার যে কত রকম অবস্থা হতে পারে সে আরেকদিন বলবো, আজ কোরিয়া যাই। প্রায় ২৫ ঘন্টা ধরে অচেনা চীন চেনার বৃথা চেষ্টা করে উড়ে উড়ে যখন সউল পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল। নেমেই শান্তি শান্তি লাগলো। অনেকেই মোটামুটি ইংলিশ বলছে। আর ফ্রি ওয়াই-ফাই। সুতরাং পৌঁছে যাবার খবর দিতে কোন অসুবিধা নাই।

সউলআমার কাজ হল যেকোন জায়গায় নেমেই একটা সিম কিনে ফেলা। ফেললাম। এয়ারপোর্ট এর ভেতরেই ‘কনভেনিয়েন্ট শপ’ এ পাওয়া যায়। বললেই দেখিয়ে দেবে। ‘usim’ আর ‘sk-telecom’। আগে থেকে এস কে এর খবর নিয়ে গেলেও ওই মুহূর্তে দোকানে ওটা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে ‘ইউ সিম’ নিতে হল। ৩৪হাজার ইয়োন। এর পর নির্দিষ্ট বাস ধরে তনুজার বাসার দিকে রওনা দিলাম। প্রচন্ড ট্রাফিক। ঢাকার মত না হলেও খুব কম-ও নয়। রাস্তায় কিছুই দেখা হয়নি। প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ৭.৩০র দিকে বাস থেকে নেমে ওয়াল্গক নামের জায়গায় যেতে খানিকটা সময় ট্যাক্সি। তনুজা একেবারে রাস্তায় এসে বাড়ি নিয়ে গেল। চমৎকার ছোট্ট দোতালা বাড়ির এক তলায় ওদের সংসার। কোরিয়ান স্টাইলতো বটেই। গোগ্রাসে ভাত গিলে বসলাম সিম চালু করতে। প্রথমে হলোনা। মন খারাপ করে ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন সকালে উঠেই সারাদিন ঘুরে বেড়াবার পরিকল্পনা ক্লান্তির কাছে হেরে গেল। ঘুমালাম। ১০টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে উঠে প্রথম কাজ সিম চালু করা। বুঝলাম আগের রাতে অত ক্লান্ত থাকায় লিফলেট ঠিকমত পড়িনি। খুবই সহজ নিয়ম। নেটে ঢুকে পাসপোর্ট এর প্রথম পাতার ছবি আপ্লোড করে একটা ফর্ম ফিল আপ করলেই ১৫ দিনের জন্য লিগাল সিম আপনার আর ইন্টারন্যাশনাল কল রেট-ও একদম সস্তা।

সউলযা হোক ওরা লাঞ্চ করে ১২টায়। তনুজা এইসময় বাসায় চলে আসে, মামুন-ও। একসাথে ভাত খেয়ে ওরা আবার ল্যাবরেটরীতে চলে গেল। আমি ঘুরতে। মামুন ম্যাপ দিয়ে এঁকে লিখে বুঝিয়ে দিয়ে গেল কোথায় গেলে ‘হপ অন-হপ অফ’ বাস পাবো। আমি নেটে দেখে আগেই পছন্দের ট্রিপ ঠিক করে নিয়েছিলাম। এখানে কিন্তু মেট্রো সবচেয়ে সহজ পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট। ম্যাপ দেখে চমৎকার বোঝা যায় তবে ইংরেজী ম্যাপ টা সংগ্রহ করতে হবে। আর মাটির নীচ থেকে বের হতে প্রচুর গুহামুখ বা ‘exit’ তাই কারো কাছ থেকে জেনে নিলে সুবিধা হবে। এবার একটু মুশকিলে পড়া গেল এখন আর কেউ ইংরেজী পারছেনা। ভালো কথা। এদের এখানে ক্যাশ ক্যারি করতে না চাইলে ‘T-Money’ নামে একটা কার্ড পাওয়া যাবে। ইচ্ছে মত টাকা আপ্লোড করে নিলে সবখানে ব্যবহার্য। আর ডিস্কাউন্ট-ও মেলে। এটাও এয়ারপোর্ট থেকে নিয়েছিলাম। প্রতি বার মেট্রো ট্রাভেলে ১২৫০ থেকে ১৩৫০ মত টাকা মানে ওদের ইয়োন কাটা হবে। যতক্ষন গুহা ত্যাগ না করছি ওই টাকাই, গাড়ী বদলে বদলে যত দুরেই যাই।

নাতাশাআমি বের হলাম বাস খুঁজতে, পেয়েও গেলাম আর ওখানেই ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন বুথ ছিল। সারাদিন, পরদিন আর কনফারেন্সের ভেন্যুতে যাবার পথ সবই সময় নিয়ে ওরা বুঝিয়ে দিলো। এরপর লাফান-বাসে চড়ে গেলাম ন্যামসান –হানোক ভিলেজে। ঝাঁ চকচকে শহরে এক টুকরো গ্রাম। ওদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি সাজিয়ে রেখেছে কয়েকটা ঘরে। হাতে বোনা পাটি, ঝুড়ি, খিমচি (দারুণ জনপ্রিয় আর সিম্বোলিক খাবার) বানানো দেখাচ্ছে। আর পাশাপাশি শো চলছে, কোরিয়ার মুক্তি সংরামের ওপর। বিশাল সুন্দর এক পার্ক এর মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা সাজানো। ছোট ছোট ঝর্ণা, বসার-হাটার জায়গা। আর স্বাধীনতার একটা মনুমেন্ট-ও আছে, কারা যেন উপহার হিসেবে দিয়েছিলো এখন ভুলে গিয়েছি। যাইহোক ওখানে ঘুরেফিরে আবার বাসে করে ছোট দুয়েকটা স্টপেজ ঘুরে নামলাম Changdeok-gung প্রাসাদে। ওরে বাবা! এত মহল টাইপ নয়। পুরনো দিনের বার বাড়ি-ভেতর বাড়ি টাইপ। নতুন রানী পুরনো রানীর আলাদা বসত। ঘর গরমের ব্যাবস্থাও মজার ।

নাতাশাপ্রতিটা দালান দোতালা তবে ভাবতে হবে ব্যাংক বেডের মত করে। নীচে আগুন জ্বালিয়ে ঘর গরমের আয়োজন, অনেকটা বিরানী দমে দেয়ার মত-ও বটে। প্রাসাদে আবার ওইদিন বিনা টিকেটে ঘোরার আমন্ত্রণ চলছিলো। আর যেখানেই যাই, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছেই। এসব দেখে তেখে আর ন্যাম্সান টাওয়ার যাওয়ার সময় হলোনা। পরদিন বিকেল ৩টায় আমার কনফারেন্স শুরু, তাই এবার সক্কাল সক্কাল উঠে দিনের শুরুটুকু ঘুরে নেবো ভাবলাম। ক্লান্তি কেটে গেছে পুরোটাই। তাই সকালে উঠেই রওনা দিলাম এদের আইকনিক টাওয়ার ‘N-Seoul Tower’। এ নেটে দেখলাম, ন্যামসান পার্ক দিয়ে ঢুকে কেবল কার-এ করেও টাওয়ারে যাওয়া যায়। কিন্তু আজ পড়লাম বিপদে পার্ক কেউ চিনছেনা এমনকি মেট্রোর স্টেশনে বসে থাকা অল্প অল্প ইংরেজী পারা লোকটাও সাহায্য করতে পারলোনা। খুবই অবাক হলাম পার্ক এর যেন কোন অস্তিত্বই নেই এদের কাছে। শেষে টাওয়ার এর সরাসরি রাস্তা ধরলাম। নাতাশা২/৫/৭ নম্বর লাইনের হলুদ বাস যায়। টি মানি দিয়ে ৮০০ টাকার টিকেট কেটে চড়লাম এবং ঠিকঠাক পৌঁছেও গেলাম। আমার সেদিনের সঙ্গী প্রায় একহাজার শিশু যাদের স্কুল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে বেড়াতে। মনে হলো পরীদের রাজ্যে চলে এসেছি। হইচই খিল খিল হাসি দুষ্টুমি, ফলে তাদের পিছুপিছু খানিকটা পাহাড় বেয়ে উঠতে চাইলাম। বুঝলাম বয়সটা বেড়েছে, এইটুকু উঠতেই কষ্ট হয়ে গেল।

নাতাশাযাহোক এইসব জায়গা যেমন হয়, উচু থেকে শহর দেখা, ১০০০ টাকায় টিকেট কেটে দেখলাম।, জিরোলাম, নেমে এলাম। এরপর ইতিউতি ঘুরতেই উল্টো পথে পার্ক পেয়ে গেলাম। এরা কেন একে এইভাবে চেনেনা তা রহস্যই রয়ে গেলো! এখানে একটা পয়েন্ট আছে যাকে সউলের জিওগ্রাফিকাল সেন্টার পয়েন্ট বলা হয় মজা লাগলো। এরপাশেই বিখ্যাত সউল প্রাচীর। ৩ রাজার তিন ডাইনেস্টির তিন রকম নির্মাণ শৈলী। অনেক দূর হেঁটে হেঁটে প্রাচীরে অবশিষ্টাংশ দেখা যায়। ছুয়ে দেখলে কেমন যেন ভারী ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভুতি। আগের দিন শহরের মাঝে মাঝে কিছু সিংহ দ্বার দেখেছিলাম তখন বুঝিনি আজ মিলিয়ে নিলাম এই প্রাচীরেরই দরজা ওই তিন দ্বার। খুবই ভাল লাগছিলো হেঁটে বেড়াতে কিন্ত এক জায়গায় সাবধান বানী ‘be aware of wild snakes’ দেখে আর না এগিয়ে কনফারেন্সে যাবার পথ ধরলাম। এবার আরো একবার পথ হারানোর পালা। যাবার কথা Grand Hilton hotel, আমায় নামিয়ে দিল Millennium Hilton hotel-এ, বোঝো ঠ্যালা। কিন্তু তার মাঝেই লাঞ্চ করলাম একটা খাঁটি কোরিয়ান হোটেলে। খাবারে স্বাদ কিন্তু দেশে যে কোরিয়ান রেষ্টুরেন্টে খাই প্রায় তার মতোই তবে গন্ধটা একটু কড়া। নতুনদের জন্য ‘bibimbup’ ডিশটা রেকমেন্ড করছি, যারা প্রথমেই প্রানীজ আমিষে যেতে চাননা তাদের জন্য আদর্শ। ভাত বা নুডলস যেকোনটার সাথেই হরেক রকম সবজি দিয়ে ডিশ। আবার বহু হাটাহাটি, বাস মিস, দৌড় সব শেষে পৌঁছলাম, ভেন্যুতে। মুল বক্তৃতা শুনে গালা ডিনারে পেটপুরে খেয়ে বাড়ী। পরদিন জরুরী মিটিং আর আমার নিজের লেকচার ছিলো তাই মোটামুটি লেখাপড়ায় দিন গেলো।

নাতাশাতারপরদিন দুপুর পর্যন্ত কনফারেন্স এরপর যবনিকাপাত। তাই আবার ভাবলাম ঘুরি। ইয়ংসান ইলেক্ট্রনিক মার্কেটে গেলাম। জিনিস পত্র আসলে সস্তা নয়। তবে মোবাইল দেখলাম, সেটা পাইকারি দরে পাওয়া যায় আর পুরনো মোবাইল-ও প্রায় নতুনের মতই ঝকঝকে। এখানে ডিউটি ফ্রি শপের একটা মজা আছে। শহরে অনেক ডিউটি ফ্রি শপ ইচ্ছেমত কেনা যাবে কিন্তু পিক করতে হবে এয়ারপোর্ট থেকে, টানাটানির ঝামেলা বেচে যায়। তবে ট্যাক্স রিটার্ন বিষয়টা এখনো একটু জটিল। বিশেষ কিছু দোকান থেকে না কিনলে, নির্দিষ্ট ফর্ম না থাকলে এবং ৩০০০ ইয়োনের উপরে না হলে আপনি ট্যাক্স রিটার্ন পাবেননা আবার সেটাও একটা রেঞ্জে। মানে ধরুন ৩০০০-৩০০০০ ইয়োনে ১৭৫০। আমি কোন রিটার্ন পাইনি বলে এর বেশী তথ্য দিতে পারছিনা। ওখান থেকে বেরিয়ে ‘Home Plus’ নামের একটা ডিপারটমেন্টাল স্টোর থেকে চকলেট আর চিপস কিনলাম। এটাই মোটামুটি সস্তার দোকান, অনেক ব্রাঞ্চ আছে। এখানকার মানুষগুলো ইংরেজী না পারায় একটু মুশকিল হল। কি যেন বলতে চাইলো, ঝুড়ি থকে ২টা জিনিস নামিয়ে রেখে যা বললো তাতে অন্য কোথাও থেকে নিতে হবে বুঝলাম কিন্তু সেটা কোথায় বুঝতে না পারায় জিনিসগুলো কেনা হলোনা।

নাতাশা৭টায় বাসায় ফিরে ওগুলো রেখে আবার বেরোলাম ম্যাজিক ফাউন্টেইন দেখবো বলে। এখানে রাস্তা ঘাট যতটা পরিষ্কার মনে হয়েছে মানুষগুলোও সৎ আর যতদুর সম্ভব সাহায্য করতে চায় তা সে ভাষা না বোঝা গেলেও। রাতের দৃশ্য দেখতে দেখতে গেলাম বানপো ব্রিজের কাছে। এ এক অসাধারন অভিজ্ঞতা। নদীর পাড়ে কত যে মানুষ শনিবার ছুটির রাত পরিবার নিয়ে এসেছে! লাউড স্পীকারে গান হচ্ছে যা মোটেও কানের বারোটা বাজায়না বরং মিষ্টি একটা আবেশ দেয়। নদীর ওপর ব্রিজ, ব্রিজের ভেতর দিয়েই নদীর পানি টেনে নিয়ে ফোয়ারার মত ঝরে পড়ার ব্যাবস্থা আর তার মাঝেই আলোর খেলা। সব মিলিয়ে পুরো family time, আমিও ভীষন মিস করছিলাম বাসার মানুষকে, ফোন করে যতটা মেটানো যায় মেটানোর চেষ্টা করলাম। অনেক দূর হেঁটে মেট্রো বদলে বদলে যেতে হয়েছিলো কিন্তু ভালো লাগায় মন ভরে গেলো। পরদিন বাড়ি ফেরার দিন। তনুজা টিফিন বেধে দিলো অনেকদূর পথ এয়ারপোর্ট, যদি ক্ষিদে পায় বা আসার দিনের মত ডিলে হয়। ওর দেয়া টিফিন খেতে খেতেই পথ পেরিয়ে এলাম। মাঝে একবার মেট্রো বদলে ট্রেনে উঠলাম। ভেজা ভেজা দিন ছিলো শহর ছাড়িয়ে গ্রাম পেরিয়ে তবে ইঞ্চন এয়ারপোর্ট। নির্ঝঞ্ঝাট ইমিগ্রেশন পেরিয়ে আবার বাসায় ফোন এখনো এত ব্যালেন্স রয়েছে যা আমার কল্পনার বাইরে!! ২০ মিনিটের মত কথা বলেও শেষ হয়নি। যাইহোক ৫দিনের সুন্দর একটা স্মৃতি নিয়ে বাড়ির পথে উড়লাম।

ডঃ এন কে নাতাশা।
সম্পাদক, দি টাইমস ইনফো।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
তারিখঃ ২৫/১০/২০১৬।

Share

আরও খবর